সাজসজ্জা, চলন-বলন সবই যেন রাজার মতো, এমনকি নধর গোঁফটাও। মাথায় পাগড়ি, পরনে জারদৌসির পাঞ্জাবি আর তার ওপর জমকালো কটি। তবে এগুলো পরিধান করেই তিনি থেমে যাননি, কটির উপর লাগিয়েছেন কেটলির তামাটে ব্রোচ। দোকানের অন্দর মহলও সাজিয়েছেন প্রাসাদের মতো।
সেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে মাটির কাপ, পিতলের জগ, আর দোকানের কোণায় রণসাজে সজ্জিত এক রাজার তাম্রমূর্তি। সেই তাম্রমূর্তির পাশে দাঁড়ানো মাথায় পাগড়ি আর শরীরে লাল শেরোয়ানি পড়া লোকটাকে সবাই ডাকছেন ‘রাজা মামা’ নামে।
তবে, এই রাজার হাতে কিন্তু কোনো তলোয়ার নেই, আছে চায়ের কেটলি। কেটলির মাধ্যমেই চা-প্রেমীদের জন্য তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন ভালোবাসা। খুলেছেন চায়ের দোকান নাম দিয়েছেন 'রাজা চায়ের আড্ডা'।
সবার কাছে 'রাজা মামা' হিসেবে পরিচিত এই ভদ্রলোকের আসল নাম আজহারউদ্দিন রাজা। রাজা মামার জন্ম ময়মনসিংহের ত্রিশালের নওধার গ্রামে। দুই ভাই, চার বোনের বড় সংসারে শৈশবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেননি বললেই চলে। ২০১৮ সালে চায়ের দুনিয়ায় তার আসার গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ।

জীবিকা নির্বাহের তাগিদে শৈশব-কৈশোর কেটেছে কখনো মানুষের বাসায় কাজ করে, কখনো রাখাল হিসেবে অন্যের গোয়াল ঘরে, আবার কখনওবা বাসে চকলেট-সিগারেট হকারি করে। কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করেও কেন জানি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হচ্ছিল না রাজা মামার।
ভাগ্যান্বেষণে ত্রিশাল থেকে পাড়ি জমান ঢাকা। বিমানবন্দর এলাকায় শুরু করেন হকারি। থাকার কোনো জায়গা ছিল না বলে বহুদিন রাত কাটিয়েছেন পাবলিক টয়লেটের ছাদে। পরবর্তীতে একজনের মাধ্যমে গ্রামের জমি বিক্রি করে পাড়ি জমান দুবাইতে।
তিনি বলেন, দুবাইয়ের হোটেলে কাজ করতে গিয়ে সাক্ষাৎ হয় রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের চা কারিগরদের সাথে। নানান স্বাদের ও নানান দেশের চায়ের হাতেখড়িও তাদের থেকেই। রপ্ত করি হরেক রকমের চা বানানো। কিন্তু, দুবাই যাত্রাও বেশিদিন সফল হয়নি।
বাহারি স্বাদের চায়ের মধ্যে রয়েছে রাজা স্পেশাল চা, রাজা স্পেশাল মালাই চা, রাজা ইরানী জাফরান দুধ চা, কাজু বাদামের চা, রাজা কাশ্মিরী গোলাপী চা, মালয়েশিয়ান চকলেট চা, তুর্কি স্পেশাল লাল চা প্রভৃতি। রাজা মামার সুস্বাদু চায়ের পেছনের রহস্য হলো, দুধের উপর চায়ের পাতা বা লিকার ব্যবহার করা।
দিনভর চুলায় জ্বাল হতে থাকে দুধ। তার উপরে যখন লিকার পড়ে তখন চায়ের স্বাদও বহুগুণে বেড়ে যায়। সকল মসলা বাছায়কৃত ও সতেজ। অভিজাত মশলা জাফরান ও পেস্তা বাদাম স্পেশাল চা তৈরির মূল উপাদান। দেশের মানুষের স্বাদের সাথে তাল মিলিয়ে তৈরি করেন কাজু বাদাম চা, পেস্তা বাদাম চা।
২০১৮ সালে দেশে ফিরে বিমানবন্দর এলাকায় ভ্যান গাড়িতে চা বিক্রি শুরু করেন রাজা মামা। তার এক কাপ চায়ের দাম ছিল ৫০ টাকা। মানুষ ৫০ টাকা কাপে চা খাবে, তা ছিল তখন অকল্পনীয়। কিন্তু যারা একবার রাজা মামার চা খেয়েছেন, তারা নাকি আর অন্য কোনো চায়ে স্বাদ পাননি - এমন দাবি রাজা মামার।
চা বিক্রিতেই ভাগ্য ফিরেছে রাজা মামার। শুরুতে মিরপুরের লাভ রোডে দিয়েছেন স্থায়ী চায়ের দোকান। এরপর একে একে দেশের নানা প্রান্তে মোট ২৮টি চায়ের দোকান দিয়েছেন তিনি।
যেগুলোর অবস্থান মূলত ঢাকার মতিঝিল, টঙ্গী, কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট, চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি, ষোলশহর, নাসিরাবাদ প্রভৃতি এলাকায়।এসব দোকানে খেতে আসা চা প্রেমিরা জানান, আড্ডার উপকরণ চা, আর চা যদি হয় রাজা মামার, তাহলে তো আড্ডা হয় আনন্দের।

শুধু চা বিক্রি করেই মাসে কয়েক লাখ টাকা মুনাফা করেন বলেও জানান তিনি। রাজা মামা বলেন, এক সময় ৪/৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরির জন্য মানুষের হাতে পায়ে ধরেছি, পাইনি। চা বিক্রি করি বলে তাচ্ছিল্য করেছে। এখন আমার চায়ের দোকানের কর্মচারীরা ১২ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা বেতন পায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রাজা জানান, তিনি দেশের সব জেলায় নিজের চা দোকান দিতে চান। আপাতত রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগ ছাড়া বাকি বিভাগগুলোতে তার চায়ের দোকান আছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই বরিশাল বিএম কলেজের পাশে নতুন একটি চায়ের দোকান দেয়ার পরিকল্পনা আছে তার।
সপ্তাহে সাতদিনই খোলা থাকে রাজা মামার চায়ের দোকান। শুক্রবার ব্যতীত বাকি দিনগুলোতে সকাল ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবারে দুপুর ২টার পর শুরু হয় চা বিক্রির কাজ-কারবার। প্রতিদিনই অনেক জনসমাগম হয় রাজা চায়ের আড্ডায়।
