নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচারহীনতার ৯ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে দেশে বিদেশে লাগাতর সহস্রাধিক কর্মসূচি পালিত হলে টনক নড়ছেনা তদন্তকারী সংস্থার।
ঘটনার ৯ বছর পূর্ণ হলেও তদন্ত পূর্ণ করতে পারেনি র্যাব। মামলার বিচারকার্য শুরু হওয়ার এ দীর্ঘসূত্রতার জন্য ত্বকীর পরিবার সরকারি সদিচ্ছাকে দায়ি করছেন। নাগরিক সমাজও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে বিচার কাজ শুরু হচ্ছেনা বলে দাবি তাদের।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ। ওই দিনই সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রাব্বি। ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা চারারগোপ এলাকার খালে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়। ওই দিন রাতেই ত্বকীর বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে ১৮ মার্চ সাংসদ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙারু পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাতকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন রফিউর রাব্বি।
ত্বকীর পরিবারের দাবি, প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী ডাক্তার সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচনী প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সে নির্বাচনে শামীম ওসমান পরাজিত হয়ে রফিউর রাব্বীর ওপর প্রতিশোধ নিতে তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ছেলে হত্যার বিচার চাইতে চাইতে ৯ বছর পার হলেও মামলার কার্যক্রম চালু না হওয়া হতাশ ত্বকীর বাবা-মা। ঘরে গিয়ে দেখা যায় ত্বকীর পড়ার ঘরটি সেইভাবেই সাজিয়ে রেখেছে। ত্বকী থাকতে ঠিক যেভাবে ছিলো।
মা-ছেলের বিভিন্ন স্মৃতি দেখে দেখে সময় পার করেন। দিনটি ঘনিয়ে আসলে যেন অনেকটা স্তব্দ হয়ে পড়েন। ত্বকী ঘরের মেঝেতে যেই জায়গাটিতে বেশিরভাগ সময় কাটতো মা দিনের একটা সময় কাটান সেই জায়গাতে বসে।
মা রওনক রেহেনা ক্যামেরায় কথা বলতে গিয়ে শুধু বললেন, ‘বিচারটা হওয়া দরকার।’
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বললেন, এ সরকারই ত্বকী হত্যার বিচার করবে।
জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠন ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে সহস্রাধিক কর্মসূচী পালন করেছে। প্রতিমাসেই কোন না কোন কর্মসূচী পালন করা হয়। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন এ ধরণের হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়।
এ মামলার বাদি পক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ বাবু বলেন, প্রথমে পুলিশ মামলাটির তদন্তে ব্যর্থ হলে বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার তদন্তভার দেয়া হয় র্যাবকে। র্যাব তদন্তভার পাওয়ার পর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইউসুফ হোসেন ওরফে লিটন, সুলতান শওকত ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকিকে গ্রেপ্তার করে।
তাদের মধ্যে ইউসুফ ও সুলতান শওকত আদালতে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। বর্তমানে এ মামলায় ৫ জন আসামি প্রত্যেকেই জামিনে রয়েছেন। আদালত বারবার তাগিদ দিলেও ৯ বছরেও চার্জশিট জমা দেয়নি তদন্তকারী সংস্থা।
বাদি পক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ বলেন, রহস্যজনক কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে এই মামলার কার্যক্রম। আগামী এপ্রিল মাসে একটি তারিখ রয়েছে। সেদিনও কোন অগ্রগতির খবর পাবেন বলে মনে হচ্ছেনা তার।
৯ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেরদিন মামলার অগ্রগতির খবর জানতে তদন্ত সংস্থা র্যাবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। এর আগে গত বছর সর্বশেষ র্যাব জানিয়েছিল অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তারা কাজ করে যাচ্ছে। যতদ্রুত সম্ভব তারা মামলার তদন্ত পূর্ণাঙ্গ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কাজ করছে।
আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ
এদিকে ঘটনার ৯ বছর উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। আগামী ৬, ৭, ৮, ১১ ও ১৮ মার্চ এসব কর্মসূচি পালন করা হবে।
৬ মার্চ (রোববার) সকাল সাড়ে আটটায় নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সিরাজ শাহর আস্তানা কবরস্থানে ত্বকীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতিহা পাঠ ও মিলাদ মাহফিল কর্মসূচী রয়েছে।
একাত্তর/আরএ
