কথা ছিলো প্রিয় গরুটি বিক্রি করে নতুন জামা কিনে বাড়ি ফেরার। সেই জামাই হবে ঈদের আনন্দ। এই আশা যেন অধরাই থেকে গেল শাহাবুরের। বিক্রি হলো না গরু। কেনাও হলো না ঈদের নতুন জামা।
কাঙ্খিত মূল্য না পেয়ে গরু বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন শাহাবুরের বাবা রবিকুল ইসলাম। মঙ্গলবার (২০ জুলাই) নেত্রকোনার দুর্গাপুরের পৌর শহরের এমকেসিএম পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত স্থানীয় অস্থায়ী গরুর হাটে ক্রেতাদের সাথে দরকষাকষি চলে তাদের। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তাও মিলছিলো না কাঙ্ক্ষিত মূল্যের দেখা।
সাদা কালো রঙের এই গরুটির ক্রেতাদের কাছে সর্বোচ্চ মূল্য উঠে ৫৩ হাজার টাকা। গরুর বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের আশা ছিলো গরুটি মূল্যে হবে ৬০ হাজার টাকার উপরে। তবে কোন ক্রেতাই এই মূল্যের ধারে কাছেও যায়নি।
শেষ মুহূর্তের হাটে কোরবানীর পশু কিনতে আসা মানুষের মাঝে যেমন ছিলো পশু কেনার প্রবণতা তেমনি বিক্রেতাদের মাঝেও ছিলো বিক্রির প্রবল ইচ্ছা। তার মাঝেও খুব কমই ক্রেতারই নজরে এসেছে শাহাবুরের গরুটি।
এমকেসিএম মাঠে বিকেলে তখন সাড়ে ছয় টার উপরে। সবুজ ঘাসে ঘেরা মাঠ তখন অনেকটাই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। আশপাশের গরু বিক্রেতা-ক্রেতা সবাই যার যার পছন্দের গরুটিকে নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে। তখনো শাহাবুরে চোখেমুখে জেগে রয়েছে নতুন জামা কেনার শেষ আশা। দেখতে দেখতে পুরো হাট ফাঁকা হয়ে সবুজ ঘাসে আস্তর ভেসে উঠছে সবার মাঝে।
এদিকে বিকেলের শেষ সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত গিয়ে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। তারপরও দেখা নেই ক্রেতার। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গরু নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করেছেন শাহাবুর ও তার বাবা।
শাহাবুরে হাতেই ছিলো সাদা রঙের গরুর দড়িটি। মাঠে বাঁশের খুঁটি থেকে দড়ি খুলতেই গরুও হাঁটতে শুরু করেছে বাড়ির পথে। তবে শাহাবুরে মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, নেই আগের সেই ঈদের আনন্দ।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের ফারাংপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রবিকুলের ছেলে শাহাবুর। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজে সহযোগিতা ও গরুটির দেখাশোনা করতো সে।
তবে করোনাকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গরুটির সাথেই অধিকাংশ সময় কেটেছে তার। গরুটির প্রতি ভালোবাসা, মমতা সবকিছুই যেন আঁকড়ে ধরেছে তাকে। তারপরও বাবার ইচ্ছে এবারের কোরবানির ঈদে বিক্রি করবে গরুটি। প্রথম দিকে তার ইচ্ছা না থাকলেও পরবর্তীতে বাবার সাথেই হাটে আসা। বাবা বলেছিলো গরু বিক্রি করে কিনে দিবে নতুন একটি জামা। পাশাপাশি বাড়ির ছোট বড় ভাইদের জন্যও কিনে নিয়ে যাবে জামা কাপড়। তাই শেষ পর্যন্ত গরুটি বিক্রি না হওয়ায় একদিকে যেমন খুশি তেমনি মনের মাঝ থেকে হারিয়েছে ঈদের আনন্দ।
শাহাবুর একাত্তরকে জানান, এই গরুটি প্রায় দেড় বছর ধরে আমাদের সাথে রয়েছে। আমাদের বাড়ির সবাই গরু দেখাশোনা করে। সময়মতো ঘাস খাওয়ানো মাঠে নিয়ে যাওয়া সবকিছুই হয় যত্ন সহকারে। স্কুল বন্ধ থাকায় আমি বেশিরভাগ সময়ই গরুটির সাথে কাটাতাম। গরুটি এখন একটু বড় হয়েছে তাই বাবা এবারের কোরবানির ঈদে গরু বিক্রি করে দিবে বলেছে। প্রথমবার শুনে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে। আমি গরু বিক্রি করতেও দেব না বলেছি। পরে বাবা গরুটি হাটে নিয়ে আসলে আমিও সাথে সাথে চলে আসছি। গরুটি বিক্রি হলে বাবা আমাদের বলেছিলো ঈদের নতুন জামা কিনে দিবে। এখন তো আর গরুটি বিক্রি করা গেলো না। মনে হয়না নতুন জামা কেনা হবে।
শাহাবুরে বাবা রবিকুল ইসলাম একাত্তরকে জানান, আমরা গরুটি দীর্ঘদিন লালন পালন করেছি এর পেছনেও অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। খরচের টাকা হিসাব করলে ৬০ হাজার টাকার উপরে বিক্রি হলে কিছুটা লাভ হতো আমাদের। কিন্তু বাজারে যে অবস্থা একেক জন একেক রকম দাম বলে। কেউ ৫০ হাজার, কেউ ৫২ আবার ৫৩ হাজার টাকা বলে। এই টাকায় গরু বিক্রি করার থেকে বাড়িতে রেখে দেওয়া আরো বেশি ভালো। তাই গরুটি বিক্রি করিনি। দেখি, ঈদের পরে ভালো দাম পেলে গরুটি বিক্রি করবো নয়তো গরুটিকে লালন-পালন করে আরও বড় করবো। গরুটি বিক্রি না করতে পারায় ছেলের মুখে হাসি নাই। কারণ গরু বিক্রি করে তাদের নতুন জামাকাপড় কিনে দেবো বলেছিলাম। এখন যেহেতু বিক্রি করতে পারি নাই তাই বেশি কিছু দিতে না পারলেও কিছু সবার জন্য কিনে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
একাত্তর/এসএ
