রাজধানীর শান্তিনগরের বাসিন্দা করিম (ছদ্মনাম) সাহেব তার ষাটোর্ব্ধ বাবাকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। তলপেটের পীড়ায় ভুগছিলেন তিনি।
বিভিন্ন পরীক্ষার পর জানায় প্র্রস্টেট গ্ল্যান্ডের প্রদাহের কারণেই এই অসহনীয় ব্যাথা, পঞ্চাশের বেশী বয়স্ক পুরুষদের জন্য এই সমস্যা বেশ পরিচিত।
কিন্তু সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে, যখন চিকিৎসকের দেয়া ওষুধ সেই প্রদাহ নিয়ণ্ত্রণ করতে পারছিলো না। অথচ প্রতি নিয়তই ব্যাথায় কাতর হয়ে পড়ছিলেন করিম সাহেবের বৃদ্ধ বাবা।
অবশেষে আরও বেশ কিছু পরীক্ষার পর জানা গেলো, প্রচলিত যে এন্টিবায়োটিক ওষুধ রয়েছে তার বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে প্রদাহ বা ইনফেকশনের জন্য দায়ী জীবাণু।
সেই দফায় ওষুধ পরিবর্তন করে রোগ থেকে মুক্তি মিলেছিলো প্রবীণ মানুষটির। তবে পরবর্তীতে নতুন করে ইনফেকশন বা অন্য জীবাণুঘটিত রোগে আক্রান্ত হলে প্রচলিত ওষুধে মুক্তি নাও মিলতে পারে বলে সাবধান করেছেন চিকিৎসক।
এমন মাল্টিড্রাগ রেজিসট্যান্স বা এন্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্সের ঘটনা কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশু অথবা ইমিউনিটি কম্প্রোমাইজড ব্যাক্তি অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে ড্রাগ রেজিসট্যান্স জীবাণু।
আর এমনটা হবার কারণ যেমন প্রাকৃতিক জীবন বৈচিত্রের পরিবর্তন তেমনি মানবসৃষ্ট কারণটা হলো এন্টিবায়োটিক ওষুধের যথেচ্ছ আর অসম্পূর্ণ ব্যবহার। গেলো এক দশক ধরেই চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বার বার উঠে আসছে মাল্টি ড্রাগ রেজিসট্যান্সির প্রসঙ্গ।
বলা হচ্ছে চিকিৎসা শাস্ত্রের সব সফলতা মলিন হয়ে যেতে পারে, ওষুধের বিরদ্ধে ক্রমান্বয়ে জীবাণুর শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে।
বাংলাদেশেও মাল্টিড্রাগ রেজিসট্যান্স নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসনের নেতৃত্বে ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাক্সিন ইন্সটিটিউট- আইভি এর অধীন সিএপিটিইউআরএ কনসোর্টিয়াম এই বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণা ফলাফলে বলা হয়, গবেষণায় প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুগুলোর মধ্যে গড়ে ৩১ থেকে ৬৭ শতাংশ জীবাণুই মাল্টিড্রাগ রেজিসট্যান্স। এছাড়াও জীবাণুভেদে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে এন্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ফলাফলে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বেশ কিছু নমুনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত অগ্রাধিকার তালিকার ক্ষতিকর রেজিসট্যান্স জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধ করতে নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণাপত্রে।
এছাড়া গবেষণা ফলাফলে বলা হয় , বাংলাদেশে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবগুলোতে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এছাড়া ল্যাবের মান নিয়ণ্ত্রেণেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আরও বলা হয়, এন্টিবায়োটিক যেসব ওষুধ ব্যবহার হবার কথা ৪০ শতাংশের ভেতরে সেসব ওষুধ বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে ৭০ থেকে ৮৮ শতাংশ হারে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স– এএমআর এবং এর ব্যবহার বিষয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
নতুন ও পুরাতন তথ্য মিলিয়ে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশের ৩৪টি ল্যাবরেটরি এবং পাঁচটি বেসরকারি মডেল র্ফামেসি থেকে গত চার বছরে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দশ লাখেরও বেশি রোগীর রিপোর্ট সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পেয়েছেন গবেষকেরা।
বুধবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষণা ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা: আহমেদুল কবির জানান, ‘এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্সি প্রতিরোধে, রেজির্স্টাড চিকিৎসকদের প্র্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। আর এজন্য সবপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ওষধ প্রশাসনের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, এন্টিবায়োটিক ওষুধসহ অন্যান্য ওষুধের গুণগত মান নিয়ণ্ত্রণে ঔষধ প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অণুসরণে করেও ঔষধ প্রশাসনের সার্ভিয়েলেন্স আরো জোরদার করা সম্ভব।
উল্লেখ গবেষণা প্রতিষ্ঠান- ইন্টারন্যাশনাল ভ্যক্সিন ইন্সটিটিউট (আইভিআই) একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যা মূলত বিশ্বব্যাপী নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও কার্যকরী ভ্যাক্সিন আবিষ্কার ও বিকাশে কাজ করে।
একাত্তর/এসএ
