সত্তর দশকে গোটা এশিয়া জুড়ে ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন চার্লস শোভরাজ। একের পর এক খুনের পেছনে তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে। হন্য হয়ে এই সিরিয়াল কিলারের পেছনে লাগে বিভিন্ন দেশের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা। তাদের রাতের ঘুম হারাম করে ছাড়েন শোভরাজ।
ভারতের গোয়া থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড, এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় খুন, ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মূলত বিদেশি পর্যটকদেরই নিশানা বানাতেন শোভরাজ, সেখান থেকেই তার নাম হয় ‘দ্য বিকিনি কিলার’।

গেলো ১৯ বছর ধরে নেপালের কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা কাটছিলেন শোভরাজ। দুদিন হলো তাকে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে মুক্তি দেয়া হয়। প্রায় দুই দশক পরে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কেমন লাগছে, এই প্রশ্নের উত্তরে চার্লস শোভরাজ বলেন, দারুণ লাগছে।
নেপালে যাতে আবার খুন বা অন্য কোনো অপরাধ করতে না পারে, তার জন্য শোভরাজকে ১০ বছরের জন্য নির্বাসিত করা হয়েছে। জেল থেকে মুক্তির পর নেপাল সরকার তরফে শোভরাজকে ফ্রান্সের বিমানে তুলে দেয়া হয়। দোহা হয়ে শনিবারই প্যারিসে পৌঁছবেন চার্লস শোভরাজ।

বিমানে বসে ‘দ্য বিকিনি কিলার’ বলেন, আমার দারুণ লাগছে। অনেক কাজ বাকি। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। নেপাল সরকারের বিরুদ্ধেও মামলা করবো। তাকে সিরিয়াল কিলার অ্যাখ্যা দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, এমনও অভিযোগ করেন ৭৮ বছর বয়সী চার্লস।
সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজের জীবনের উপর ভিত্তি করেই নেটফ্লিক্স ও বিবিসি একটি ওয়েব সিরিজ প্রচার করে। ওই ওয়েব সিরিজটির নাম ‘দ্য সারপেন্ট’। দ্রুত রূপ বদল আর কারাগার থেকে পালানোর জন্য শোভরাজের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।

শোভরাজের বাবা ছিলেন ভারতীয়, মা ভিয়েতনামের। পরে তার মা একজন ফরাসি নাগরিককে বিয়ে করেন। ছোট থেকেই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ, দূরত্বের কারণে কুপথে চলে যায় চার্লস। অল্প বয়সেই হাত পাকে অপরাধে। ১৯৭০-র দশকে শুরু হয় তার অপরাধের আসল কাহিনী।
দামি পাথর ব্যবসায়ী সেজে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতো চার্লস। তারপর সুযোগ বুঝে তাদের মাদক খাইয়ে লুঠপাট ও খুন করত। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনামে ধরা পড়েন শোভরাজ। বিকিনি পরিহিত এক আমেরিকান নারী খুনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
সেখান থেকেই তার নাম হয় ‘দ্য বিকিনি কিলার’। পরে তদন্তে জানা যায়, ২০টিরও বেশি খুন করেছেন চার্লস। যাদের বেশিরভাগ নারী। শোভরাজ দাকি করছেন, যে কোন নারীকে তিনি পটাতে সক্ষম। নারীর প্রতি তার ছিলো বিশেষ আসক্তি।

নেপালে মার্কিন নারী কনি জো ব্রনজিচকে খুনের দায়ে তাকে ২০০৩ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই ১৯ বছর নেপালের কাঠমান্ডু জেলেই ছিলেন শোভরাজ। ২০১৪ সালে সে কানাডার পর্যটক লরেন্টকে খুনের ঘটনায় তাকে আবারও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
১৯৮৬ সালে শোভরাজ সহযোগীদের নিয়ে দিল্লির তিহার জেল থেকে পালিয়ে গেলেও দ্রুত ধরা পড়েন। ১৯৯৭ সালে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মুক্তি পান তিনি। এরপর ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের এক ক্যাসিনোর বাইরে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে নেপালি কর্তৃপক্ষ।

বিকিনি কিলার হিসাবে খ্যাত শোভরাজ অনেক দেশের পুলিশের রাতের ঘুম হারাম করেছিলো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার শিকার ছিলো হিপি নারীরা। প্রথমে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তাদের সঙ্গে নেশা করতো এবং তারপর তাদের হত্যা করতো।
আরও পড়ুন: কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার শোভরাজ কারাগার থেকে মুক্ত
শোভরাজ এতটাই ধূর্ত ছিল যে, পুলিশ তার অপরাধের সন্ধান পাওয়ার আগেই সে অপরাধ করে পালিয়ে যেত। এই কারণে সে ‘দ্য সারপেন্ট’ বা সাপ নামেও পরিচিত ছিলো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশেই তার বিরুদ্ধে বিদেশি পর্যটকদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে সে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অন্তত ২০ জনকে হত্যা করেছিল বলে শোনা যায়।
একাত্তর/এসি
