ইরান-ইসরাইল পরস্পরের বিরুদ্ধে বহু বছরের ছায়াযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এখন প্রকাশ্যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ। আর ঠিক সময়েই আবারও আলোচনায়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ইসরাইল ও পশ্চিমাদের কাছে বড় ভয় ইরানের এটম বোমা তৈরির সক্ষমতা নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের আট দেশের কাছে পরমাণু বোমার ভাণ্ডার রয়েছে, তাহলে ইরানের থাকলে সমস্যা কোথায়?
পরিসংখ্যান বিষয়ক ওয়েবসাইট স্টাটিস্টা ডটকমের হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গোটা বিশ্বে পরমাণু বোমার সংখ্যা ছিলো ১২ হাজার ৫১২টি। এর প্রায় ৯০ ভাগই রয়েছে বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর দেশ রাশিয়া ও আমেরিকার কাছে। সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৮৮৯টি পরমাণু বোমা আছে রাশিয়ার কাছে। আর আমেরিকার কাছে আছে ৫ হাজার ২৪৪টি। এরপর সবচেয়ে বেশি চীনের কাছে ৪১০টি।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সদস্য ফ্রান্সের হাতে আছে ৪১০টি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। আর যুক্তরাজ্যের কাছে রয়েছে ২৯০টি এটম বোমা। বিস্ময়করভাবে এরপরেই সবচেয়ে বেশি পরমাণু বোমার মালিক পাকিস্তান। তাদের কাছে রয়েছে ১৭০টি। আর দেশটির চিরশত্রু ভারতের ভাণ্ডারে আছে ১৬৪টি। এরপরেই আছে দুষ্টু রাষ্ট্র ইসরাইল, তাদের কাছে রয়েছে ৯০টি। তবে, বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করে না দেশটি।

অন্যদিকে, রকেট কিমের দেশ উত্তর কোরিয়ার কাছে আছে ২০টি পারমাণবিক বোমা। জাতি সংঘের হিসাব অনুযায়ী ইরানের কাছে কোন পরমাণু বোমা নেই। তবে বহুদিন ধরে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে আসছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য শান্তিপূর্ণ উদ্দেশে ব্যবহারের জন্যই তাদের এই কর্মসূচি। তবে ইরানের এমন দাবির বিষয়ে সব সময় সন্দেহ পোষণ করে আসছে পশ্চিমারা।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, কর্মসূচির আড়ালে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি। শুধু বলেই ক্ষান্ত হয়নি। এজন্য দেশটির ওপর গত কয়েক দশক ধরে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তারা। পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়ই এমন খবর প্রচার করা হয় যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। যে কোনো সময় তারা এই মারণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে।

তেহরান এসব খবরকে গুজব বলে দাবি করেছে। এরপরও আশ্বস্ত হয়নি আমেরিকা। ইরাককে আলোচনার টেবিলে ডেকে আনা হয়। ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরের বছর ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে কার্যকর হয়। চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন’। তবে এটি ইরান পরমাণু চুক্তি হিসেবেই বেশি পরিচিত।
কিন্তু দুই বছর না যেতেই চুক্তিটিকে ‘বাজে ও ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে তা থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে বের হয়ে উল্টো আবারও নিষেধাজ্ঞা খেলায় মেতে উঠে দেশটি। ফলে ওই চুক্তি তার কার্যকারিতা হারায়। ইরানও তার পরমাণু কর্মসূচি নতুন করে শুরু করে। এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।

২০২০ সালের শুরুর দিকে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয় ইরান। সেই সঙ্গে জানিয়ে দেয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও গবেষণায় আর কোনো সীমাবদ্ধতা রাখবে না তেহরান। অবস্থা বেগতিক দেখে আবারও আলোচনায় আগ্রহ দেখানো জো বাইডেন। পশ্চিমাদের সাথে আলোচনা শুরু করে ইরান। তৈরি হয়েছিলো আরেকটি খসড়া। তবে এখন পর্যন্ত কোন চুক্তি হয়নি।
মাঝে কেটে গেছে তিনটি বছর। এই সময়ে পশ্চিমাদের স্নায়ুর উপর দিয়ে হাঁটাহাঁটি করেছে ইরান। বলছে, তারা কোন পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে না। আর যদি তৈরি করার উদ্যোগ নেয় তাহলে কেউ ঠেকাতে পারবে না। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ জানিয়েছে, ইউরোনিয়ম আরও সমৃদ্ধ করে দিনদিন পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে ইরান।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, ইরান কয়েকটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করে ফেলেছে। তেহরান এখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেনি। তবে যে কোনো সময় তৈরি করে ফেলতে পারে। ৯৯ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে পরমাণু অস্ত্র করা যায়। ইরান ৭০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করে ফেলেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে পশ্চিমারা চাইলেও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে আটকাতে পারবে না। ইরান তার ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পরমাণু অস্ত্র বানাতে চায় না। এনিয়ে পশ্চিমারা যে, ক্রমাগত মিথ্যা বলে যাচ্ছে, সেটা তার বেশ ভালোভাবেই জানে।

তবে ইরান তার পরমাণু নীতিতে পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক টক্করের পর ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিভাগের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ হাক তালাব বলেছেন, দখলদার ইসরাইল যদি ইরানের পরমাণু কেন্দ্র ও স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় তাহলে তেহরান চুপ করে বসে থাকবে না, বরং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে হাত দেবে।

পশ্চিমারা বিশ্বাস করে, ইরান চাইলে পারমাণবিক বোমা বানাতে পারে। তাদের অনুমা, ইরান যদি চায় তাহলে এটি এখন এক মাসের মধ্যে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা করতে পারে। এরপর তৈরি করতে হবে একটি ওয়ারহেড যা ব্যালিস্টিক মিসাইলে বসাতে হবে। এর জন্য সময়সীমা বের কঠিন, তবে কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এটি তৈরি করতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে।
ইরান-ইসরাইলের নীরবতায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আভাস!