গেলো ৮ এপ্রিল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও, ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক মহল নতুন করে যুদ্ধ শুরুর জন্য চরম ছটফট করছে। ওয়াশিংটন যখন ইরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে ঝুঁকছে এবং তেহরানের ওপর পুনরায় বোমাবর্ষণের হুমকি থেকে পিছু হটছে, তখন ইসরাইলি প্রশাসন এই যুদ্ধবিরতিকে মেনে নিতে পারছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের উদ্বেগ অগ্রাহ্য করে এই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি এক ফোনালাপে ট্রাম্পের এমন অনমনীয় মনোভাবের পর ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর অবস্থা এখন ‘মাথায় আগুন লাগার’ মতো।
ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী মানসিকতা কতটা তীব্র, তা স্পষ্ট হয় ডানপন্থী টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল ১৪’-এর সঞ্চালক শিমন রিকলিনের একটি লাইভ মন্তব্য থেকে। তিনি লাইভ অনুষ্ঠানে অসাবধানতাবশত তেহরানের একটি অতি গোপনীয় ইউরেনিয়াম মজুত কেন্দ্রের অবস্থান ফাঁস করে দেন এবং দাবি করেন, এটি ইসরাইলের পরবর্তী হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এই ঘটনায় ইসরাইলি পার্লামেন্টের (নেসেট) সদস্যরা তীব্র সমালোচনা শুরু করলে ওই সঞ্চালক পরে একে ‘কাল্পনিক বা তাত্ত্বিক আলোচনা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে এই পরিকল্পনা যে কেবল আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ হলো এই সপ্তাহে নেতানিয়াহুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের দ্বিতীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ও ইসরাইলি গোলাবারুদ ছুড়েও তেহরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়নি, এই ক্ষোভ থেকে ইসরাইলি নীতিনির্ধারকরা নতুন করে সংঘাত শুরুর পথ খুঁজছেন।
ইসরাইল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ক্ষুধা অনেকটাই কমে গেছে। এর প্রধান কারণ ইরানের শক্তিশালী প্রতিরোধ কৌশল। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
এই ধরনের একটি ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং অনিশ্চিত যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার চেয়ে পিছু হটাই এখন ওয়াশিংটনের কাছে বেশি যৌক্তিক মনে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তো স্পষ্ট করেই বলেছেন, নেতানিয়াহু সেটাই করবে, যা আমি তাকে করতে বলব। মার্কিন সবুজ সংকেত ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে এককভাবে যুদ্ধ শুরু করা অসম্ভব।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ৮ এপ্রিলের এই যুদ্ধবিরতি নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিড এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এই চুক্তিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। লাপিড একে ইসরাইলের ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

‘ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক মে মাসের শুরুতে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইসরাইলি নাগরিক মনে করেন, এই অসমাপ্ত যুদ্ধবিরতি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী। বেন-গুরিয়ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হাগাই রাম জানান, ইসরাইলি জনগণকে দশকের পর দশক ধরে ‘ইরানোফোবিয়া’ বা ইরান-ভীতির মধ্যে বড় করা হয়েছে। তাদের বোঝানো হয়েছে যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং ইরানকে নতজানু করা ছাড়া ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব নয়। ফলে সাধারণ মানুষও এই যুদ্ধবিরতিকে পরাজয় হিসেবে দেখছে।
নিউইয়র্কে নিযুক্ত সাবেক ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস মনে করেন, নেতানিয়াহু মূলত তিনটি কারণে আবার যুদ্ধ শুরু করতে মরিয়া:
১. ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা থেকে জনগণের নজর সরাতে তাঁর একটি বড় কৌশলগত বিজয় দরকার, যা গাজা বা লেবাননে সম্ভব নয়।
২. ইসরাইলিদের ধারণা, এত বড় যুদ্ধের পরও ইরানকে কোনো শিক্ষা দেয়া যায়নি, তাই মিশনটি অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
৩. আগামী আগস্টে ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হতে নেতানিয়াহুর ঝুলিতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় 'সাফল্য' দেখানো অত্যন্ত জরুরি।
কিছুদিন আগে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অহংকার করে বলেছিলেন, আমেরিকার সবুজ সংকেত পেলেই তারা ইরানকে বোমা মেরে ‘পাথরের যুগে’ ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব নেতানিয়াহু আগে অনুমান করতে পারেননি।
সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের ভেতরে এখন দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষ চায় যুদ্ধ এখানেই থামিয়ে ক্ষতি সামাল দিতে। অন্য পক্ষ, যার নেতৃত্বে আছেন নেতানিয়াহু, তারা চাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের উপকূলে জড়ো করা মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে ইরানকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে। তবে এই যুদ্ধের রিমোট কন্ট্রোল যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের হাতেই রয়েছে, তা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
