একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ছয় সপ্তাহ কেটে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো আলোর মুখ দেখেনি। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র করে তুলেছে।
এমন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে এসেছে নতুন করে হামলার হুমকি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর মনের মতো ‘সঠিক উত্তর’ না পেলে পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু হবে। ঠিক এই চরম মুহূর্তেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটাতে বৃহস্পতিবার থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে পাকিস্তান।

আসিম মুনিরের তেহরান সফর: যুদ্ধ থামানোর ‘শেষ সুযোগ’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, শান্তি আলোচনাকে ত্বরান্বিত করতে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আজ তেহরান সফর করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের এই তেহরান সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটনের কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বার্তা বহন না করলে এই পরিস্থিতিতে এমন সফর সম্ভব হতো না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এটিকে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোর ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। তবে এই শেষ সুযোগের পথেও এখনো বেশ কিছু জটিল ও অমীমাংসিত শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টেবিলের দুই প্রান্তে বিপরীতমুখী শর্তের পাহাড়
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে দু’পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী কিছু দাবি ও শর্ত:
ইরানের দাবি ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি: তেহরান প্রথমত এই মর্মে একটি পোক্ত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা চাচ্ছে যে ভবিষ্যতে তাদের ওপর আর কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হবে না। একই সাথে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, বিদেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা সব ইরানি আর্থিক সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং নিজেদের অর্জিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অন্তত একটি নির্দিষ্ট অংশ দেশের ভেতরেই রাখার অনুমতি দাবি করছে।
আমেরিকার অনমনীয় অবস্থান: ইরান গ্যারান্টি চাইলেও ওয়াশিংটনের পক্ষে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না যে ইসরায়েল ভবিষ্যতে ইরানের ভেতরে ঢুকে উচ্চপর্যায়ের কোনো গুপ্তহত্যা বা টার্গেট কিলিং চালাবে না। উপরন্তু, মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে ইরানকে তাদের সমস্ত পারমাণবিক স্থাপনা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। কেবল তেহরানের প্রধান স্থাপনাটি চালু রাখা যাবে, তবে সেখানে কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা চলবে না।
শর্তের পাশাপাশি চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো দাবি হলো, চুক্তির সমস্ত শর্ত একযোগে বা সবটুকু একবারে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিপরীতে ইরান বলছে, চুক্তি সইয়ের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে যদি যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে, তবে বাকি শর্তগুলো ধাপে ধাপে পরবর্তী পর্যায়গুলোতে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

‘অন্য অপশনও তৈরি আছে’ ট্রাম্পের হয়ে রুবিওর হুঁশিয়ারি
চলমান এই অচলাবস্থার মাঝেই কিছুটা ইতিবাচক সুর শোনা গেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কণ্ঠে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, মার্কিন-ইরান চুক্তি সফল হওয়ার পেছনে কিছু ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা আশা করছি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের এই তেহরান সফর আলোচনাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই একটি ভালো চুক্তির পক্ষে এবং এটিই তাঁর প্রথম পছন্দ। যদি আমরা একটি ভালো সমাধান বের করতে পারি, তবে তা হবে চমৎকার।
তবে আশার বাণী শোনানোর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে একটি কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন রুবিও। তিনি বলেন, আমি এখনই অতিমাত্রায় আশাবাদী হতে চাই না, দেখা যাক আগামী কয়েকদিনে কী ঘটে। তবে যদি একটি সম্মানজনক চুক্তি করা সম্ভব না হয়, তবে প্রেসিডেন্টের কাছে যে অন্য অপশন বা সামরিক পথ খোলা রয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেই অন্য অপশনগুলো কী, তা আমি বিস্তারিত বলতে চাই না; কারণ সবাই খুব ভালো করেই জানে ট্রাম্প কী করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েকদিনের পাকিস্তানি মধ্যস্থতা এবং তেহরানের মনোভাবের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা
