ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে দেখা দেওয়া এই প্রাদুর্ভাব—যেখানে প্রায় ২৪৬ জন সন্দেহভাজন রোগী এবং ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে—তা মহামারি জরুরি অবস্থার মানদণ্ড পূরণ করে না। খবর বিবিসির।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে যা শনাক্ত ও রিপোর্ট করা হচ্ছে, প্রকৃত প্রাদুর্ভাব সম্ভাব্যভাবে তার চেয়ে ‘অনেক বড়ো’ হতে পারে এবং এর স্থানীয় ও আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ইবোলার বর্তমান স্ট্রেনটি ‘বুন্দিবুগিও’ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট, যার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা নেই। আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে ২১ দিনের ইনকিউবেশন পিরিয়ডের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রাথমিক লক্ষণগুলো হঠাৎ দেখা দেয় এবং তা ফ্লু-এর মতো হয়; যার মধ্যে রয়েছে জ্বর, পেশী ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বমি, ডায়রিয়া, ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকমতো কাজ করে না। কিছু রোগীর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তপাতও হতে পারে।
সংস্থাটি আরও জানায়, এখন পর্যন্ত আটটি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ভাইরাস আক্রান্তের ঘটনা রয়েছে। এছাড়া ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়া এবং স্বর্ণখনির শহর মঙ্গওয়ালু ও রুয়ামপারাসহ তিনটি স্বাস্থ্য অঞ্চলে অন্য সন্দেহভাজন আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ইতুরি থেকে ফেরা একজন রোগীর মাধ্যমে কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় একজনের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া ভাইরাসটি ডিআর কঙ্গোর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রতিবেশী উগান্ডায় দুটি নিশ্চিত আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। উগান্ডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার মারা যাওয়া ৫৯ বছর বয়সী এক কঙ্গোলীয় নাগরিকের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ এসেছিলো। উগান্ডা সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, তার মরদেহ ইতিমধ্যে ডিআর কঙ্গোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি রোববার জানিয়েছে, বর্তমানে এম২৩ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর গোমায় একটি পরীক্ষাগারে নতুন করে ইবোলায় আক্রান্তের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে এই প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা এবং ভৌগোলিক বিস্তার সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, ডিআর কঙ্গোতে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট, জনসংখ্যার উচ্চ চলাচল, সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুর শহুরে অবস্থান এবং এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বাণিজ্য ও যাতায়াতের কারণে ডিআর কঙ্গোর সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিআর কঙ্গো এবং উগান্ডাকে জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংক্রমণ বিস্তার কমাতে সংস্থাটি বলেছে, শনাক্ত হওয়া রোগীদের অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে, যতোক্ষণ না কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে করা দুটি বুন্দিবুগিও ভাইরাস-নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসে। একই সাথে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর নজরদারি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদন আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরের দেশগুলো যাতে ভয় পেয়ে সীমান্ত বন্ধ বা ভ্রমণ ও বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ না করে, সেই আহবান জানিয়ে সংস্থাটি বলেছে, এমন পদক্ষেপের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
আফ্রিকা সিডিসি এর আগে জানিয়েছিল যে, রুয়ামপারা ও বুনিয়ার শহুরে পরিবেশ এবং মঙ্গওয়ালুতে খনি কার্যক্রমের কারণে রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. জিন কাসেয়া বলেন, আক্রান্ত এলাকা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ‘উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা চলাচল’-এর কারণে আঞ্চলিক সমন্বয় অপরিহার্য।
১৯৭৬ সালে বর্তমান ডিআর কঙ্গোতে প্রথম ইবোলা আবিষ্কৃত হয়। ধারণা করা হয়, ফলভোজী বাদুড়ের মতো সংক্রামিত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এটি প্রথম ছড়ায়। দেশটিতে এটি এই মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগের ১৭তম প্রাদুর্ভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইবোলার কোনো প্রমাণিত নিরাময় নেই এবং এর গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০%। তবে বুন্দিবুগিও ইবোলা ভাইরাসের পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাবগুলোতে ৩০% থেকে ৫০% মানুষ মারা গেছে। জায়ার প্রজাতির ইবোলার জন্য টিকা থাকলেও বুন্দিবুগিও-এর জন্য কোনো টিকা নেই।
গত ৫০ বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে এই ভাইরাসে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মারা গেছেন। ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে মারাত্মক প্রাদুর্ভাবটি ঘটেছিল ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, যে সময়ে প্রায় দুই হাজার ৩০০ জন মারা যান। এছাড়া গত বছর একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাদুর্ভাবের পর ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
