ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সামরিক বা কূটনৈতিক জয় নিশ্চিত করতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য বড় সংকট বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই দীর্ঘসূত্রিতার প্রভাব বেশ নেতিবাচক। বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের উচ্চমূল্য ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রতিফলন রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তার হার ৩৪ শতাংশে নেমেছে।

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইসরাইলি ও মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে, তবুও ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো, যেমন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা ইরানের পারমাণবিক পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
গত শুক্রবার ইরান আলোচনার জন্য একটি নতুন প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন। ইরানের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখা। তবে, ট্রাম্প শুরুতেই পারমাণবিক বিষয়টির সমাধান চান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান পুনরায় সংশোধিত প্রস্তাব পাঠালেও ট্রাম্প তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি হরমুজ প্রণালীকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা না যায়, তবে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে। জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেন ফেল্ডের মতে, ট্রাম্পকে হয়তো এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখা হবে, যিনি বিশ্বকে আরও বেশি অনিরাপদ করে তুলেছেন।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প এখন দীর্ঘমেয়াদী 'নাভাল ব্লকেড' বা নৌ-অবরোধের পরিকল্পনা করছেন যাতে ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে তাদের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করা যায়। একইসাথে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি 'সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী' হামলার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছে। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছেন না।

দুর্বল অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় নজিরবিহীন ধাক্কা দেয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। বিশ্লেষক জন অল্টারম্যানের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে, তারা চাইলে যখন-তখন বিশ্ব তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন বন্ধ করে দিতে পারে, যা ইরানকে যুদ্ধের আগের চেয়েও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। এছাড়া গত জুনের বিমান হামলার পরও ভূগর্ভে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অক্ষত আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করেছেন এবং জার্মানি, স্পেন ও ইতালি থেকে সেনা প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন। এদিকে ইরানে মার্কিন হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেসিসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর সেখানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আআরজিসি) অধীনে আরও কঠোরপন্থী নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে।

ট্রাম্পের আহ্বানে ইরানি জনগণ তাদের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতেও কোনো আগ্রহ দেখায়নি। সব মিলিয়ে, ট্রাম্প এখন এক কঠিন দ্বন্দ্বে আছেন। একদিকে তিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন, অন্যদিকে ইরানের ওপর পূর্ণ বিজয় ঘোষণা করার মতো কোনো ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান এখন সময়ের অপেক্ষা করছে, কারণ ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও তেলের উচ্চমূল্য তাকে দীর্ঘকাল এই সংঘাত চালিয়ে যেতে বাধা দেবে। তবে, এর বিপরীতে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি কতদিন টিকে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
