মধ্যপ্রাচ্যে যখনই উত্তেজনা বাড়ে, লেবানন তখনই কঠিন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জর্জরিত দেশটি আবারও এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া এক যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায় তবে তাঁর দল ‘নিরপেক্ষ’ থাকবে না। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরি ও সামরিক সরঞ্জামের ক্রমাগত আগমন সংঘাতের প্রস্তুতিকেই স্পষ্ট করছে।
ট্রিগার চাপবে কে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করতে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, অন্যথায় সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, হিজবুল্লাহ কি লেবাননকে আবারও একটি নতুন ‘সমর্থন যুদ্ধে’ টেনে আনবে?
সামরিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জর্জ নাদেরের মতে, হিজবুল্লাহর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বৈরুতে নয়, বরং তেহরানে নির্ধারিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইলিয়াস জোগবিও মনে করেন, হিজবুল্লাহ এখন নিজের সামরিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে দলটি হয়তো যুদ্ধে জড়াত না, কারণ তারা জানে এর ফলে নেতৃত্ব ও জনসমর্থনের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করার ক্ষমতা দলটির নেই।

সদিচ্ছা বনাম সক্ষমতা
তেহরান যদি যুদ্ধের নির্দেশ দেয়ও, হিজবুল্লাহর তা বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা বর্তমানে আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ জানিয়েছেন নাদের। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের আগের তুলনায় দলটির শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। লেবানন সেনাবাহিনী এবং ইসরাইলি বিমানবাহিনীর ক্রমাগত নজরদারি ও হামলার কারণে তাদের কৌশলগত দক্ষতা বা ম্যানুভার করার ক্ষমতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ইলিয়াস জোগবি মনে করেন, হিজবুল্লাহর বর্তমান সক্ষমতা আগের ‘সমর্থন যুদ্ধের’ পর্যায়ের চেয়ে অনেক কম। ফলে ইরানের সমর্থনে তারা কোনো নতুন যুদ্ধে নামলেও তা আগের মতো কার্যকর হবে না।

হুমকির মুখে লেবানন
রয়টার্স ও সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী যে কোনো সময় ইরানে হামলার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। উত্তর কমান্ডের মেজর জেনারেল রাফি মিলো জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনো অনিশ্চিত।
জোগবি সতর্ক করে বলেন, হিজবুল্লাহর যে কোনো হস্তক্ষেপের জবাবে ইসরাইল এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক আঘাত হানবে। এটি দলটির জন্য ‘মর্মান্তিক সমাপ্তি’ এবং লেবাননের জন্য ‘বিধ্বংসী ক্ষতি’ বয়ে আনতে পারে। তাঁর মতে, ইসরাইল এবার হিজবুল্লাহর হুমকি চিরতরে নির্মূল করার সুযোগ খুঁজতে পারে।

ধ্বংসাত্মক মূল্যের শঙ্কা
হিজবুল্লাহর যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর বিভাজন দেখা দিয়েছে। দেশটি যখন চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে ধুঁকছে, তখন নতুন কোনো যুদ্ধের ধকল সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর জাসিম আজাকা জানান, ২০২৬ সাল লেবাননের ইতিহাসের কোনো সাধারণ বছর নয়। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের যুদ্ধের প্রভাবে লেবানন ইতোমধ্যে ৮.৫ বিলিয়ন ডলার এবং জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে।
পর্যটন ও কৃষি খাত ধ্বংসের মুখে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং হাসপাতালগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
জোগবি অবশ্য ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, হিজবুল্লাহর যুদ্ধে জড়ানোর ফলে একদিকে যেমন জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে, অন্যদিকে এটি লেবাননকে গত তিন দশকের ‘অস্ত্রের শাসন’ থেকে মুক্ত করার একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে।
সূত্র; আলহুরা.কম
ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বাড়তি সুরক্ষা