মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বার্তা পাওয়া গেলেও, ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে তারা দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। এই যুদ্ধে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে; অঞ্চলজুড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ এবং নিহতের সংখ্যা ১,৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। ইতিহাসের অন্যতম বড় এই শিল্প বিপর্যয়ের ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা স্বয়ং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এক নজরে দেখা নেয়া যাক যুদ্ধের ১১তম দিনের প্রধান সংবাদ শিরোনামগুলো-

ট্রাম্প প্রশাসনের মন্তব্য: মঙ্গলবার যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, শত্রুকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থামবে না। তবে তিনি যোগ করেন, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের সমাপ্তি নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। সোমবার ট্রাম্প নিজেই বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেন; এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন মার্কিন লক্ষ্য প্রায় অর্জিত এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে, অথচ এর ঠিক পরেই হাউজ রিপাবলিকানদের তিনি বলেন, আমরা এখনো যথেষ্ট জিতিনি।
মেয়েদের স্কুল: ইরানি মেয়েদের স্কুলে হামলার রেশ এখনো কাটেনি। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ওই হামলায় অন্তত ১৬৮ জন শিশু নিহত হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন অন্য কোনো দেশ এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তিনি মিথ্যা দাবি করেন, ইরানের কাছেও 'টমাহক' মিসাইল রয়েছে (যেটি এই হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়)। এর আগে একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে যে, স্কুলের পাশে অবস্থিত একটি ইরানি নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে মার্কিন মিসাইল আঘাত হানছে।

তেল সরবরাহ বিঘ্নিত: যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে- ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর মঙ্গলবার তেলের দাম কিছুটা কমলেও বাজার এখনো অস্থির। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বর্তমানে ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন দেশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাকিস্তান চরম কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ঘোষণা করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করেছে এবং জি-৭ মন্ত্রীরা কৌশলগত তেলের মজুদ ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
এদিকে ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে না বললেও জানিয়েছেন যে তিনি তেল-সংক্রান্ত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবেন এবং দাবি করেন, এই যুদ্ধের ফলে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম কমবে।

হরমুজ প্রণালী: মঙ্গলবার মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য সামরিক পাহারার ব্যবস্থা করার কথা ভাবছে সেনাবাহিনী। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই প্রণালীটি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ট্রাম্প ট্যাঙ্কার অপারেটরদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি হুমকি দিয়েছেন, ইরান তেল সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা করলে তাদের ওপর আরও কঠোর আঘাত হানা হবে। জবাবে ইরান বলেছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য অপেক্ষা করছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকো সতর্ক করেছে, এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে বিশ্ব তেলের বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

ইরানি নারী ফুটবল দল: একটি সূত্র সিএনএন স্পোর্টসকে জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া ফুটবল দলের আরও একজন খেলোয়াড় এবং একজন স্টাফ সদস্যকে মঙ্গলবার আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এর আগে পাঁচজন খেলোয়াড়কে মানবিক ভিসা দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। দলের বাকি সদস্যরা এখন ইরানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানে ইসরাইলের হামলা: তেহরানে অবস্থানরত সিএনএন প্রতিনিধিরা গত রাতে ভারী বিমান হামলা অনুভব করেছেন, যার প্রচণ্ডতায় ভবনের দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। শহরের এক বাসিন্দা জানান, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের তীব্রতায় ঘুমানো "অসম্ভব" হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি আবাসিক ভবনে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে। ইসফাহানে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

লেবাননে ইসরাইলি অভিযান: হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলার পর দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে গণ-উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশসমূহ: প্রতিবেশী দেশগুলো মঙ্গলবার নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম বড় একটি তেল শোধনাগারে হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ইরাকি কুর্দিস্তানে একটি মার্কিন ঘাঁটি ও আমিরাতি কনস্যুলেট লক্ষ্য করে ছোঁড়া ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, যার ধ্বংসাবশেষ থেকে কনস্যুলেটের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়ারা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।

ইরানের কঠোর অবস্থান: ইরানের একজন সামরিক কমান্ডার সোমবার জানিয়েছেন, তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করবে এবং এখন থেকে শুধু এক টনের বেশি ওজনের বিস্ফোরকবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হবে। এছাড়া ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সিএনএনকে বলেছেন, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাবে এবং শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মাধ্যমেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে।

ক্রমবর্ধমান মৃত্যুমিছিল: জাতিসংঘ এবং একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, ইরান ও লেবাননে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১,২০০ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক এবং অন্তত ৪৮৬ জন লেবানিজ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। এছাড়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর পাশাপাশি সাতজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
সূত্র: সিএনএন
