ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। সূত্রমতে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হতে পারে, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলো এতে অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।
ইরানের আইএসএনএ নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান শিগগিরই তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তারা একটি চুক্তিতে আসতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে এবং এটি খুবই সম্ভব যে আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব।
এর আগের দিন, শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করেন। এই জলপথটির কার্যত অবরোধ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করছে। ইরান হরমুজ প্রণালীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চাপ দিয়ে আসছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের পাঁচভাগের একভাগ সরবরাহ করা হয়।
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব সম্পর্কে এবং বিশেষজ্ঞরা ইরানের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে বলে মনে করছেন, সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।

যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবটি কী?
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, দুই পক্ষ একটি ১৪ দফার দলিলের বিষয়ে ‘কাছাকাছি’ পৌঁছেছে। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করতে সম্মত হবে এবং অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখবে।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করবে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালীতে উভয় পক্ষের জারি করা পাল্টাপাল্টি অবরোধ চুক্তি সইয়ের ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
ইরান কয়েক দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলেও, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া সেই ঐতিহাসিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প বেরিয়ে আসার পর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। নিষেধাজ্ঞার ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ইরানের কোটি কোটি ডলারের সম্পদ এখনও জব্দ অবস্থায় রয়েছে।
তবে, এই সমঝোতা স্মারকটি গত সপ্তাহে ইরানের প্রস্তাবিত ১৪ দফার পরিকল্পনা থেকে ঠিক কতটা আলাদা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মতে, এই আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। যদি উভয় পক্ষ প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়, তবে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৩০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
পূর্ণাঙ্গ চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকা ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধের অবসান ঘটবে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে এবং ইরানের জব্দকৃত তহবিল ফেরত দেওয়া হবে। এতে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই সমঝোতা স্মারকে প্রাথমিকভাবে কোনো পক্ষকেই বড় কোনো ছাড় দিতে হবে না। তবে ওয়াশিংটনের আগের কিছু প্রধান দাবির উল্লেখ এখানে নেই যা ইরান বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে; যেমন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করা। এছাড়া, ইরানের কাছে থাকা ৪০০ কেজিরও বেশি (৯০০ পাউন্ড) প্রায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়েও সূত্রগুলো কিছু জানায়নি।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার বলেছেন, দুই নেতা একমত হয়েছেন , ইরান যাতে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালায়।
এরপর ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ এখনও সেই ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে।
তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে তারা কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

ইরান কি এই প্রস্তাবে রাজি হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি। তবে ইরানি নেতারা এর বিরোধিতা করেছেন। ইরানের পার্লামেন্টের প্রভাবশালী পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এই খসড়া প্রস্তাবকে ‘বাস্তবতার চেয়ে আমেরিকার আকাশকুসুম কল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দুই পক্ষ খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, এমন খবরকে উপহাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইংরেজিতে লিখেছেন, ‘অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ফেইলড’
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি রসুল সরদার আতাস বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ইরান এখনো মার্কিন প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। এরপর বৃহস্পতিবারই পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তাদের প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির খবরকে স্বাগত জানায়। তবে তারা জানিয়েছে যে এই মুহূর্তে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হবে না। আল জাজিরা অ্যারাবিককে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমরা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে উভয় পক্ষের বিশ্বাস হারাতে চাই না।”
আতাস আরও বলেন, ইরানিরা বলছে, এই পর্যায়ে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে না; এটি শুধুমাত্র সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়।

তিনি যোগ করেন, তেহরান সরাসরি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমোজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। যদি এটি অর্জিত হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
আল জাজিরার আরেক প্রতিনিধি আলমজিদাদ আলরুহাইদ মঙ্গলবার তেহরান থেকে জানিয়েছিলেন, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান একটি ‘অত্যন্ত কঠোর রেড লাইন’ বা সীমারেখা টেনে দিয়েছে। তাঁর মতে, “পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে কোনো আপস হবে না।”
সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিটের মতে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার যে দাবি ট্রাম্প করছেন তা অবাস্তব এবং তেহরান সম্ভবত এটি মেনে নেবে না।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এই আলোচনায় ইরান যদি কোনো বিষয়ে জেদ ধরে থাকে, তবে সেটি হলো ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার, যা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে অনুমোদিত।
কিমিট আরও যোগ করেন, এমনকি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও ইরানকে সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
তবে কিমিট ধারণা করছেন, ট্রাম্প হয়তো ইরানের বর্তমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশের বাইরে পাঠাতে চান। তাঁর মতে, ইরান হয়তো ইউরেনিয়াম বাইরে পাঠাতে রাজি হতে পারে অথবা সেগুলোকে সমৃদ্ধহীন অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
তবে আলরুহাইদ জানান, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে বাধা দিচ্ছে। ধারণা করা হয় ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন।

আল জাজিরার প্রতিনিধি আলরুহাইদ বলেন, হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব এখন আলোচনার টেবিলের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখছি ইরানিরা সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছে। তারা প্রতিটি জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন প্রোটোকল ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা, যারা ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে, তারা কোনো শর্ত ছাড়াই এই প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য চাপ দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর, ইরানও মূলত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।
ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শেষ করার মতো একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বললেও এখন পর্যন্ত তা সফল হয়নি। ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষ এখনো নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। একটি পাকিস্তানি সূত্র এবং মধ্যস্থতার বিষয়ে অবগত অন্য একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি প্রায় নিশ্চিত।
সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে। তবে আল জাজিরা স্বতন্ত্রভাবে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
