ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম একটি কাতারি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস- এলএনজিবাহী ট্যাঙ্কার সফলভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। রোববার 'আল খারাইতিয়াত' নামের এই জাহাজটি পাকিস্তানের পোর্ট কাসিমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মাঝে এই ঘটনাকে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই স্বস্তির খবরের পাশেই কুয়েত ও আরব আমিরাতের আকাশসীমায় ড্রোনের আনাগোনা শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ছে।
শিপিং অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই প্রথম কাতারি জাহাজ যা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পাড়ি দিল। জ্বালানি আমদানিতে স্থবিরতার কারণে পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। এই গ্যাস ট্যাঙ্কারটি পৌঁছালে দেশটিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের দুই অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের সাথে আস্থা বাড়াতেই ইরান এই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।

তেহরানের হুঁশিয়ারি ও ওয়াশিংটনের অপেক্ষা
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও ইরানের বার্তা কিন্তু এখনো বেশ কড়া। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' জানিয়েছে, যেসব দেশ ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে, তাদের জাহাজ চলাচলে বাধার সম্মুখীন হতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, শান্তি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম এলসিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি খুব দ্রুতই ইরানের জবাব পাওয়ার আশা করছেন।

চাপের মুখে ট্রাম্প ও মিত্রদের অনীহা
চলতি সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর রয়েছে। এই সফরের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো তাঁর জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এই দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মহলে খুব একটা সমর্থন পাচ্ছে না। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি ছাড়া হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাথে বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের এই অনীহা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও ব্রিটেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে একটি বহুজাতিক মিশনে অংশ নিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরব আমিরাত ও কুয়েতে ড্রোন আতঙ্ক
এক মাসের যুদ্ধবিরতির পর গত দুই দিনে পরিস্থিতি আবারও কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলার পর রোববার ভোরে কুয়েতের আকাশসীমায় বেশ কিছু রহস্যময় ড্রোন শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বাহিনী এবং মার্কিন জাহাজের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে।
কাতারি ট্যাঙ্কারের নিরাপদ প্রস্থান একটি ক্ষুদ্র আশা জাগালেও, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীকে স্থায়ীভাবে ‘শত্রু রাষ্ট্রের জাহাজ’ চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ করে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সিআইএ-র মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরান আরও চার মাস এই অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে। ফলে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি ঝুলে আছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
