১০ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইবে নাকি সংঘাত আরও চরম আকার ধারণ করবে, তা নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা। মার্কিন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ তৃতীয় কোনো দেশে পাঠাতে রাজি হয়েছে। তবে শর্ত একটাই, পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কোনোভাবেই ধ্বংস করা যাবে না। তেহরানের এই ‘গরম-নরম’ কৌশলের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

মার্কিন শান্তি প্রস্তাবের জবাবে কয়েক পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যা পাঠিয়েছে ইরান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের কিছু ইউরেনিয়াম হালকা করবে এবং বাকিটা কোনো তৃতীয় দেশে সরিয়ে নেবে। তবে, এই সমঝোতার ক্ষেত্রে ইরান গ্যারান্টি চেয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সেই ইউরেনিয়াম যেন তাদের ফেরত দেয়া হয়। অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা- তাসনিম নিউজ এই ইউরেনিয়াম বিনিময়ের খবরকে সরাসরি ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে, যা ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়েছে।
শান্তি প্রস্তাব টেবিলে থাকলেও ট্রাম্পের মেজাজ যেন সপ্তমে। রোববার, সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, ৪৭ বছর ধরে ইরান আমাদের সাথে শুধু খেলা করেছে, আমাদের মানুষকে মেরেছে। আমাদের 'গ্রেট এগেইন' দেশটিকে নিয়ে হাসাহাসি করার দিন শেষ!
ট্রাম্প পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, শিগগিরই কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে তিনি 'প্রজেক্ট ফ্রিডম'-এর মতো বড় কোনো সামরিক অভিযানে যেতে দ্বিধা করবেন না। একই সুরে সুর মিলিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, ইরান থেকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে না ফেলা এবং তাদের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস না করা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়নি।

হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি বাজারের হাহাকার
যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাসের সরবরাহকারী হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত অচল। সৌদি আরামকো’র সিইও আমিন নাসের সতর্ক করেছেন, আজই যদি প্রণালীটি খুলে দেওয়া হয়, তবুও বাজার স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এই সংকটের মধ্যেই কাতার থেকে পাকিস্তানে এলএনজিবাহী একটি জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়ে আলোচনার নতুন সূত্রপাত ঘটিছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের জন্য এটি বড় স্বস্তি হলেও, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও বিপজ্জনক।
ড্রোনের আনাগোনা ও রাজপথের লড়াই
একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রোববারই কাতারের কাছে একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতও দাবি করেছে, তারা বেশ কিছু শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এছাড়া ইরান হুমকি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ব্রিটিশ বা ফরাসি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি দেখা গেলে তার কড়া জবাব দেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বর নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম কমানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরমাণু ইস্যুর চেয়ে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়াকেই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, একটি ‘অস্থায়ী চুক্তি’র মাধ্যমে আপাতত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তবে ইরান কি শেষ পর্যন্ত তাদের পরমাণু স্বপ্ন বিসর্জন দেবে, নাকি ট্রাম্পের ‘অন্য পথ’ বেছে নেওয়ার হুমকি সত্যি হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বশান্তি। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০১ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান দিচ্ছে।
