পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের আড়ালে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে অত্যন্ত গোপনে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তান-মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এই হামলাগুলো চালায় আমিরাত।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালায় সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেই সময় ইরান হামলার কথা স্বীকার করলেও, রহস্যজনকভাবে আমিরাতের নাম উল্লেখ করেনি। তবে, এর প্রতিশোধ নিতে তারা দেরি করেনি; আমিরাত ও কুয়েত লক্ষ্য করে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান।

প্রকৃতপক্ষে, পুরো যুদ্ধজুড়ে ইসরাইলের চেয়েও বেশি ইরানি হামলার শিকার হয়েছে আরব আমিরাত। দেশটির শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিন ইরান হামলা চালিয়েছে, যা দেশটিকে এই যুদ্ধের সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
চমকপ্রদ তথ্য হলো, আমিরাতের এই আগ্রাসী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র মোটেও নাখোশ হয়নি। বরং তারা বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন চাইছিল উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিক। যেহেতু তখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি, তাই আমিরাতের এই হামলাকে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক মনে করেছে ওয়াশিংটন।
আরব আমিরাতকে দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সবথেকে স্থিতিশীল দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ইরানের ক্রমাগত হামলায় দেশটির পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট (আবাসন) খাতে ধস নেমেছে। বিপুল পরিমাণ কর্মী ছাঁটাই এবং অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়ে আমিরাত তাদের আগের অবস্থান বদলে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেদের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তারা অন্য দেশগুলোর মতো চুপ না থেকে সরাসরি ইরানে হামলার পথ বেছে নেয়।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতের সামরিক বাহিনী সব থেকে আধুনিক ও শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত। তাদের বিমান বাহিনীতে রয়েছে উন্নত ফরাসি মিরাজ এবং মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। এছাড়া এই যুদ্ধে ইসরাইলের সাথে আমিরাতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় আমিরাত ইসরায়েলি ‘আয়রন ডোম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক নৌবাহিনী গঠনের পক্ষেও সোচ্চার ছিল দেশটি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ দিনের ছায়াযুদ্ধ কাটিয়ে আমিরাত যেভাবে সরাসরি ইরানে আঘাত হেনেছে, তা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের সমীকরণগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও, আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার এই চরম উত্তেজনা যেকোনো সময় আবারও নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
