গত মাসের যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্যে যখন এক ধরনের আপেক্ষিক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিলো, ঠিক তখনই আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি জোরদার করেছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই দুই দেশের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি। মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এই নতুন অভিযান চালানো হতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এবারের সম্ভাব্য অভিযানের অন্যতম মূল লক্ষ্য হতে পারে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা। আর এই অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য বিশেষ মার্কিন কমান্ডো বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই অভিযান সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় একটি শক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার সেনা। এর ফলে ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চরম ঝুঁকি রয়েছে।
এই কমান্ডো অভিযানের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরিকল্পনাও মার্কিন ও ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের টেবিলে রয়েছে। এর বাইরে আরেকটি বিকল্প হিসেবে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোতে আরও ব্যাপক আকারে বিমান হামলা চালানোর প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

ইসরাইলি নেতাদের দাবি, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় চালানো তাদের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে উদ্ভূত হুমকি কমানো এবং ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করা।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪০ দিনের তীব্র সংঘাতের পরও গত মাসের শুরুতে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত এই লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায়। জবাবে তেহরানও ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয় এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়।

প্রায় পাঁচ সপ্তাহব্যাপী এই ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছিলেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি চললেও এবং যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও, ভেতরে ভেতরে নতুন হামলার এই ছক মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই নতুন যৌথ রণকৌশল যদি সত্যিই আগামী সপ্তাহে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ফেলবে তা বলাই বাহুল্য।
