ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সরাসরি সংঘাত ও চরম উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। বৃহস্পতিবার ভোরে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় মার্কিন বিমান হামলার জবাবে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে তারা কুয়েতের ওই মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক পাল্টা আঘাত হেনেছে। কয়েক ঘণ্টা আগে বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে দাবি তেহরানের।
আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, এই প্রতিক্রিয়া শত্রুর জন্য একটি গুরুতর হুঁশিয়ারি, যাতে তারা জানতে পারে যে কোনো আগ্রাসনই জবাবহীন থাকবে না। আর এর পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হবে আরও বেশি সুনির্দিষ্ট ও বিধ্বংসী।

পরবর্তীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, স্থানীয় বুধবার রাত ১০টা ১৭ মিনিটে ইরান কুয়েতের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা কুয়েতি প্রতিরক্ষা বাহিনী সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস বা ইন্টারসেপ্ট করেছে। সেন্টকম এই ঘটনাকে ইরানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক যুদ্ধবিরতির এক চরম ও জঘন্য লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সেন্টকম তাদের বিবৃতিতে আরও দাবি করেছে, এর আগে ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে স্পষ্ট হুমকি তৈরি করে ৫টি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ উৎক্ষেপণ করেছিল, যার সবকটিই মার্কিন বাহিনী ধ্বংস করেছে। এছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সাইট থেকে ষষ্ঠ ড্রোনটি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় মার্কিন বাহিনী সেখানে আঘাত হেনে সেটি প্রতিহত করে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে হুমকি তৈরি করায় তারা ইরানের ৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেন এবং বন্দর আব্বাসের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে হামলা চালান। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই সামরিক পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ পরিমাপিত, আত্মরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার স্বার্থেই নেওয়া হয়েছিল।
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন স্থাপনের চেষ্টায় থাকা ইরানি নৌকাগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী আরেকটি হামলা চালিয়েছিল, যা সেন্টকম নিশ্চিত করার পর ইরান তাকে যুদ্ধবিরতির মারাত্মক লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানায়।

এই সংঘাতের রেশ ধরে ইরানের সাথে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া মন্তব্য করে বলেছেন, আমি এই আলোচনার অগ্রগতিতে এখনও সন্তুষ্ট নই, তবে আমরা সন্তুষ্ট হব। নয়তো আমাদের এই কাজ পুরোপুরি শেষ করতে হবে (যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে)।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানের ওপর ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসন শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরানও ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসলামাবাদে হওয়া শান্তি আলোচনা কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দিলেও ইরানি বন্দরগামী সমস্ত জাহাজের ওপর কঠোর অবরোধ বজায় রেখেছেন, যা দুই দেশকে আবারও এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
