আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নিরসনে যখন ওয়াশিংটন এবং তেহরানের কূটনীতিকরা বড় ধরনের মতপার্থক্যগুলো দূর করে একটি স্থায়ী শান্তি সমঝোতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই নতুন করে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে বসলো মার্কিন প্রশাসন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শনিবার সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, যদি কোনো কারণে এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে ইরানের ওপর আবারও পুরোদমে সামরিক হামলা শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক ফোরাম ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এ অংশ নিতে সিঙ্গাপুরে অবস্থানের সময় হেগসেথ এই কড়া বার্তা দেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন পেন্টাগন প্রধান বেশ দম্ভের সাথেই বলেন, প্রয়োজনে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার পূর্ণ সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে আমাদের অস্ত্রের যে বিশাল মজুত রয়েছে, তা যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ফলে সামরিক অবস্থানের দিক থেকে আমরা অত্যন্ত সুবিধাজনক জায়গায় আছি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনই চূড়ান্ত কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, বরং তিনি কিছুটা ধৈর্য" ধরছেন। ট্রাম্প এমন একটি ‘চমৎকার চুক্তি’ করতে চান যা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ করে দেবে।
এর আগে গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে তিনি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসবেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শুরুতে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর কথা রয়েছে, যাতে করে উভয় পক্ষের আলোচকরা একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি তৈরি করার পর্যাপ্ত সময় পান।

সিঙ্গাপুরের এই প্রতিরক্ষা সম্মেলনে হেগসেথ আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের সাথে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে থাকলেও আমেরিকা কিন্তু এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর থেকে তাদের মনোযোগ সরায়নি। চীনের উত্থান ঠেকাতে এই অঞ্চলে মার্কিন নজরদারি আগের মতোই বহাল থাকবে দাবি করে তিনি বলেন, আমেরিকা একই সাথে দুটি বড় কাজ করতে সক্ষম। আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্প খাতকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শক্তিশালী করছি, যার ফলে খুব শিগগিরই আমরা আগের চেয়ে ২, ৩ এমনকি ৪ গুণ বেশি গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করতে পারব। বিশ্বের যেখানেই আমাদের সামরিক পরিকল্পনা বা অপারেশন চলুক না কেন, সেখানে ফান্ডের কোনো অভাব হবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর এই বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু করে। বিগত কয়েক মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মূলত ইরান এবং লেবাননের হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের জেরে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মারাত্মক মন্দা ও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক মহল মনে করছে, একদিকে হোয়াইট হাউসের শান্তি আলোচনার টেবিল গরম রাখা, আর অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের মঞ্চ থেকে পেন্টাগন প্রধানের এমন যুদ্ধের হুংকার, এটি আসলে আলোচনার টেবিলে ইরানকে চাপে ফেলে নিজেদের শর্ত মানিয়ে নেয়ার একটি সুদূরপ্রসারী মার্কিন কৌশল। এখন দেখার বিষয়, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই চরম হুঁশিয়ারির জবাবে তেহরান তাদের পরমাণু নীতি ও হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেয়।
