চলমান ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন এ যাবৎ যে ধরনের সামরিক সাফলতা দাবি করে আসছিল, তা বড় ধরনের ধাক্কা খেল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর উপগ্রহ চিত্র এবং ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন মাসের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত আট দেশে ছড়িয়ে থাকা ২০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যৌথ স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে ইরান।
মার্কিন প্রশাসনের জনসমক্ষে স্বীকার করা তথ্যের চেয়ে এই হামলার ব্যাপ্তি এবং ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ অনেক বেশি ও সুদূরপ্রসারী।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বাহিনী ইরানের ভেতরে এবং লেবাননে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর থেকে তেহরান এই পাল্টা আঘাতগুলো হানে। পেন্টাগনের দাবি, তারা এ পর্যন্ত ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে।
তবে হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করছিল, ইরানি সামরিক বাহিনীকে প্রায় পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্রে মার্কিন ঘাঁটির যে ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে তেহরানের পাল্টা হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত এবং মারাত্মক।
এই বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা অপারেশনাল সিকিউরিটি বা সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

তথ্য গোপনের মার্কিন চেষ্টা ও বাস্তব চিত্র
যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য লুকাতে আমেরিকা বড় ধরনের কৌশলও নিয়েছিল। তারা উপগ্রহ চিত্র সরবরাহকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট’-কে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ছবি প্রকাশের ওপর ‘অনির্দিষ্টকালের’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানায়।
তবে বিবিসি ভেরিফাই অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট দাতা এবং ‘প্ল্যানেট’-এর আগের ছবিগুলোর সাথে তুলনা করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন এবং ওমানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত ঘাঁটির প্রকৃত সংখ্যা ২৮টিও হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে আমেরিকার বিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আরব আমিরাতের আল রুয়াইস ও আল সাদর বিমান ঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ‘থাড’ ব্যাটারি সিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো বিশ্বে আমেরিকার মাত্র আটটি সচল থাড ব্যাটারি রয়েছে, যার প্রতিটির নির্মাণ খরচ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। আইরিশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস-অ্যাডমিরাল মার্ক মেলেট জানান, এই ব্যাটারিগুলো পুরো অঞ্চলের মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়ের মূল ‘হৃৎপিণ্ড’, যা চাইলেই দ্রুত বা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান ও সামরিক অবকাঠামো
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলোর ওপর নিখুঁত নিশানা লাগিয়েছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে বোমার আঘাতে তৈরি হওয়া বিশাল গর্ত ও পুড়ে যাওয়া বিমানের অবশিষ্টাংশ স্পষ্ট দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান রয়েছে।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজানেও একাধিকবার হামলা হয়েছে। সেখানে জ্বালানি সংরক্ষাণাগার, বিমানের হ্যাঙ্গার, সেনানিউয়াস এবং ক্যাম্প আরিফজানের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
পেন্টাগনের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের পেছনে ইতিমধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যার বড় অংশই যাবে ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনে। ডেমোক্র্যাটদের মতে, প্রকৃত খরচের অঙ্কটা এর চেয়েও অনেক বেশি।
এছাড়া গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকার এফ-১৫ ও এফ-৩৫ ফাইটার জেট, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ-১০ অ্যাটাক প্লেনসহ অন্তত ৪২টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সস্তা ড্রোনের কাছে আমেরিকার ‘যুদ্ধকালীন আত্মতুষ্টি’
আমেরিকার এই অতিমূল্যবান সামরিক হার্ডওয়্যারের বিপরীতে ইরান মূলত ব্যবহার করেছে অত্যন্ত সস্তা এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক ড. কেলি গ্রিয়েকো জানান, যুদ্ধের শুরুতে ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তারা কৌশল বদলে ছোট ছোট স্কোয়াডে সুনির্দিষ্ট এবং উচ্চ-মূল্যের মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিখুঁত আঘাত হানতে শুরু করে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এক ধরনের আত্মতুষ্টি বা অহমিকায় ভুগছিল। প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে এর আগেও হামলা হওয়া সত্ত্বেও তারা মার্কিন বিমানগুলোকে ইরানি ড্রোন ও মিসাইলের নাগালের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়নি, যার খেসারত দিতে হয়েছে কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান হারিয়ে।

খামেনির হুংকার ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি
এই সামরিক সাফল্যের খতিয়ান টেনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য আর আমেরিকান ঘাঁটির জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নয়। অঞ্চলের কোনো দেশ বা মাটি আর মার্কিন ঘাঁটির জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে না এবং দিন দিন আমেরিকা তার পূর্বের আধিপত্যবাদী অবস্থান থেকে ছিটকে পড়বে।
খামেনির এই বক্তব্যের পরপরই গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার জবাবে আবারও একটি মার্কিন ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যা চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।
ড. গ্রিয়েকো সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং নতুন করে ইরান পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। কারণ বিগত কয়েক মাসের লড়াইয়ে আমেরিকা ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, যা রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে পরবর্তী ইরানি ঝড় সামলানোর মতো পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখন আর পেন্টাগনের হাতে নেই।
