ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেকার সম্ভাব্য ‘ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি’ সই হওয়ার আগেই মাঠের বাইরের কূটনীতিতে শুরু হয়ে গেছে তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন হামলা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে বলেন, দু’পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
কিন্তু শুক্রবার ইরানের সরকারি ও সংবাদমাধ্যমে সেই চুক্তির খসড়া ফাঁস হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ট্রাম্প। ফাঁস হওয়া শর্তগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক হুংকারে লিখেছেন, চুক্তি নিয়ে তারা যে দুর্বল ও করুণ বিবৃতি দিয়েছে, তার সাথে সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। অত্যন্ত অসম্মানজনক লোক এরা। এদের অভিধানে ‘সততা’ বলে কিছু নেই। অসাধারণ! ওদের বলব, নিজেদের শুধরে নাও, তাও আবার খুব দ্রুত!

রয়টার্সকে দেয়া ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বয়ান এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা ইরনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিতে মূলত ইরানের কট্টর শর্তগুলোরই জয় হয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের ঝুলিতে প্রায় কিছুই পড়েনি! ইরানি সূত্র বলছে, খসড়া অনুযায়ী আমেরিকা ইরানের তেলের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের শত কোটি ডলারের তহবিল বা ফান্ড অবমুক্ত করবে এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য থাকবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমেরিকার প্রধান মাথাব্যথা ‘পারমাণবিক কর্মসূচি’র বিষয়টি এই চুক্তি থেকে আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে, যা নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা হবে।

এছাড়া, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান যে কৌশলগত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল এবং জাহাজ চলাচলে সামরিক অনুমতি বাধ্যতামূলক করেছিল, সেই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও ইরান ছাড়ছে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে না গিয়ে হরমুজ প্রণালীর চাবিকাঠি নিজেদের পকেটেই রাখছে তেহরান।
ইরানের এই একতরফা দাবি মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। স্বয়ং ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতা ও কট্টরপন্থী ধারাভাষ্যকাররা ট্রাম্পের এই নমনীয় নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নেমেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি ফাস হওয়া তথ্যকে ‘ভুল তথ্য’ বা ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেন, শুধুমাত্র একটি চুক্তি সই করা বা বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য ইরানকে কোনো নগদ অর্থ বা তহবিল দেয়া হবে না। ইরান যদি চুক্তির শর্ত বা নিজেদের দায়িত্ব শতভাগ পালন করে, তবেই ধাপে ধাপে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
একই সাথে নিজের দলের সমালোচকদের এক হাত নিয়ে ভ্যান্স বলেন, যে মানুষগুলো মাত্র এক মাস আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রেসিডেন্ট বলছিলেন, তাঁরাই এখন কিছু অসমর্থিত মিডিয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তাঁর তীব্র সমালোচনা করছেন! প্রেসিডেন্ট যেভাবে হোক আমাদের জন্য একটা দুর্দান্ত ফলাফল নিয়ে আসবেন, এটুকু ভরসা রাখুন।

হোয়াইট হাউস আর তেহরানের এই বাকযুদ্ধের মাঝেই আশার আলো দেখিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গত কয়েক মাস ধরে পর্দার আড়ালে পাকিস্তান এই দুই পরমাণু ও সামরিক শক্তির মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল। শুক্রবার এক্সে এক পোস্টে শাহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির চূড়ান্ত লিখিত টেক্সট বা খসড়া উভয় পক্ষই নী
তিগতভাবে মেনে নিয়েছে। তিনি দুই দেশের প্রেসিডেন্টকে ট্যাগ করে লেখেন, আমরা নিশ্চিত করছি যে, শান্তি চুক্তির একটি চূড়ান্ত এবং সর্বসম্মত টেক্সটে পৌঁছানো গেছে। পাকিস্তান এখন পরবর্তী পদক্ষেপগুলো চূড়ান্ত করতে উভয় পক্ষের সাথেই নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ইতিহাসে শান্তি কখনোই এত কাছাকাছি আসেনি, যা এখন এসেছে।

একই সুরে সুর মিলিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও। ট্রাম্পের রাগান্বিত টুইটের পরও তিনি স্পষ্ট করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি এখন হাতের মুঠোয়।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের তীব্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেই কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই শান্তি চুক্তিকে নস্যাৎ করতে প্রতিনিয়ত মনগড়া প্রচারণা চালাচ্ছে। ওয়াশিংটন আর তেহরানের এই চরম মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শেষ পর্যন্ত টেবিলে সই হওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনে, নাকি আবারও বারুদের গন্ধে ভারী হয় আকাশ, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা-এএফপি
