যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান প্রায় ছয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ এবার এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। সোমবার ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক আক্রমণ বা ‘ডি-ডে’ বলে অভিহিত করেছেন। বিপরীতে ইরান জানিয়েছে, এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও আর বাইরে রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।

সোমবার ওয়াশিংটন সময় দুপুর ১টায় বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা প্রকাশ করবেন স্কট বেসেন্ট। এক নিবন্ধে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, যেসব দেশ ভয়ের বশে বা তোষণ নীতির মাধ্যমে এখনও ইরানের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছে, তাদের পরিণতি ভেবে দেখা উচিত। বিশেষ করে ইরানের তেলের মূল ক্রেতা চীনকে এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের সাথে সহযোগিতার তাগিদ দেয়া হলেও বেইজিং সোজা ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের পরিকাঠামো ধ্বংস এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেও দেশটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ভালোভাবেই ধরে রেখেছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির করে দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যেই প্রবল অস্থিরতা তৈরি করেছে তেহরান।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, যদি এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তবে শুধু হরমুজ প্রণালীই নয়, পারস্য উপসাগরের কোনো স্থান থেকেই এক ফোঁটা তেলও বিদেশে রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। একই সাথে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশ অংশ নিলে বা সমর্থন জানালে, সেটিকে সরাসরি 'যুদ্ধের শামিল' বলে গণ্য করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
গত জুন মাসের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো মুখোমুখি আলোচনা না হওয়ায় কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্ক মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার তেহরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তিনি আঞ্চলিক শান্তি রক্ষা ও মার্কিন এই নতুন নিষেধাজ্ঞার সার্বিক দিক নিয়ে ইরানি নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করবেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা অবমূল্যায়নে বিপর্যস্ত, যার ওপর এই দীর্ঘ যুদ্ধ ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। দীর্ঘ ছয় মাসের এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই নতুন ‘অর্থনৈতিক হামলা’ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে এক অজানা অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
