বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত আবাসন প্রতিষ্ঠান- চায়না এভারগ্র্যান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে চীনের একটি আদালত। সংস্থাসমূহের আর্থিক ধসে দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরির পাঁচ বছর পর, একাধিক আর্থিক জালিয়াতির দায়ে বৃহস্পতিবার শেনঝেন শহরের একটি আদালত এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে।
এক সময়ের এশিয়ার শীর্ষ ধনী ৬৭ বছর বয়সী হুই কা ইয়ান গত এপ্রিলে জালিয়াতির আটটি অপরাধ স্বীকার করেন। এর মধ্যে রয়েছে তহবিলের অপব্যবহার, তহবিল সংগ্রহে প্রতারণা, অবৈধভাবে জনসাধারণের আমানত গ্রহণ, বেআইনি ঋণ প্রদান, জালিয়াতির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ইস্যু এবং ঘুষ প্রদান।

আদালতের দেওয়া রায়ে হুই কা ইয়ানের ব্যক্তিগত সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শেনঝেন আদালত এভারগ্র্যান্ড গ্রুপকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান ($১.৩১ বিলিয়ন ডলার) এবং এর প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘হেংদা রিয়েল এস্টেট’-কে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করেছে।
হুই কা ইয়ান ছাড়া প্রতিষ্ঠানের আরও ৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ৬ থেকে ১৮ বছরের কারাদণ্ডসহ আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এভারগ্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মোট ৫৬ জনকে আদালতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি নিশ্চিত করেছে।

আদালত রায়ে জানায়, অভিযুক্তদের অপরাধের মাত্রা ছিল অত্যন্ত গুরুতর, যার ফলে অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি তৈরি হয়েছে।
৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণে নিমজ্জিত এভারগ্র্যান্ডের ব্যর্থতা কেবল দেশীয় বাজারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং অসংখ্য সাধারণ মানুষের সঞ্চয় মুছে দিয়েছে। ওয়েলথ-ম্যানেজমেন্ট প্রোডাক্টের আওতায় লভ্যাংশ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ইতিপূর্বে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
হুই কা ইয়ানের এই সাজা সাধারণ ভুক্তভোগী ও দেশি-বিদেশি পাওনাদারদের জন্য বিশেষ স্বস্তি আনতে পারেনি। সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাড়ি ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে মূল অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।

হেনান প্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে দাদীর কাছে বেড়ে ওঠা হুই কা ইয়ান স্টিল টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি এভারগ্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন এবং অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার আগ্রাসী কৌশলে এটিকে চীনের বৃহত্তম আবাসন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। ২০১৭ সালে ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে তিনি এশিয়ার সেরা ধনী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তবে ঋণখেলাপির জেরে ২০২৩ সালে তাকে চীনা কর্তৃপক্ষ আটক করে। ২০২৪ সালে হংকংয়ের একটি আদালত এভারগ্র্যান্ড বিলুপ্তির নির্দেশ দেয় এবং গত বছর এটি হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির তরলীকরণ কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।

অগাস্ট পর্যন্ত ৪৫ বিলিয়ন ডলার পাওনার বিপরীতে মাত্র ২৫৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক এই প্রধান নির্বাহী ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে অতীতে দেওয়া ৬ বিলিয়ন ডলারের ডিভিডেন্ড ও বোনাস পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আদালতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন লিকুইডেটররা।
