সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদ প্রস্তুতকারী চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দুই কর্মচারী রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (০২ মার্চ) সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছেন সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া।
তিনি জানান, গত ৭ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধন অধিদফতরের রেজিস্টার জেনারেল মো. রাশেদুল ইসলাম সিআইডিকে একটি আবেদনে করেন। ওই আবেদনে অবৈধ বিকল্প পদ্ধতিতে কে বা কাহারা জন্ম ও মূত্যু নিবন্ধন সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে সনদ প্রস্তুত করছে। তাদেরকে চিহ্নিতকরণ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন।
এরপর সিআইডি এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে কয়েকজন ভিকটিমের সাথে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করে। ভিকটিমদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ‘জন্ম নিবন্ধন হেল্প ডেস্ক’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায়। যেখানে ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বলছে একদিনেই দেশের যে কোনো জেলার জন্ম/মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করুন।
সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) ওই ফেসবুক গ্রুপের এডমিনসহ ভিকটিমের সাথে জন্ম নিবন্ধনের ব্যাপারে যোগাযোগকারী চক্রটিকে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সাইবার ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট শাখা গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অভিযান তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেপ্তাররা হলেন- ফেসবুক গ্রুপের দুইজন এডমিন মো. মাহবুব আলী (২৪), মো. শাহ আলম (২৫)। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৪ এর স্প্রেম্যান মো. হাসান তারেক (৪৭) এবং ভ্যাকসিনেটর কোহিনুর সুলতানা (৪৫) নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানা যায়, ফেসবুক গ্রুপটি মো. মাহবুব আলী ও মো. শাহ আলম পরিচালনা করত। তারা ফেসবুকের মাধ্যমে লোভনীয় বিজ্ঞাপনের দিয়ে সারাদেশ থেকে ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে এবং মো. ফয়সাল তার দোকানে ফরম পূরণ করতে আসা ক্লায়েন্টদের দেওয়া তথ্যের সাথে ভুয়া তথ্য সংযোজন করে জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট তৈরির ফাইল তৈরি করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৪ এর ওই দুইজন কর্মচারীর নিকট জমা দিতো।
প্রতিটি ফাইলের বিপরীতে ৫৫০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা করে দিত। যদিও জন্ম নিবন্ধনের সরকারি ফি-মাত্র ৫০ টাকা। এই কাজে তারা দেশের সকল জেলা হতে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করত তার সাথে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৪ এর আওতাধীন এলাকার একটি মাত্র বিদ্যুৎ বিলের কাগজ সকল আবেদনের সাথে সংযুক্ত করে দিত। অনেক ক্ষেত্রে মিরপুরের একটি স্কুলের ট্রান্সক্রিপ্ট এডিট করে সেখানে শুধুমাত্র ছাত্র/ছাত্রীর নাম, পিতার নাম পরিবর্তন করে একই রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরে ট্রান্সক্রিপ্ট একাধিক আবেদনের সাথে সংযুক্ত করে দিত এই চক্র। এই কাগজ কোনোরকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই চক্রটিকে জন্ম সনদ দেওয়া হত।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৪ এর হাসান ও কোহিনুর নামে দুই কর্মচারি অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা অফিসারদের সহযোগিতায় আইডি পাসওয়ার্ড নিয়ে সার্ভারে প্রবেশ করে ভুয়া তথ্য সংবলিত আবেদনপত্রে জন্ম/মৃত্যু নিবন্ধন সার্টিফিকেট ইস্যু করে মো. মাহবুব আলী ও ফয়সালকে সরবরাহ করত।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, বিগত ৬ মাস যাবত তারা সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে অন্তত তিন হাজার ভুয়া সনদ ইস্যু করেছে এবং এ কাজে তাদের অফিসের আরও কর্মচারী এবং সিটি কর্পোরেশনের উত্তর-দক্ষিণসহ অন্যান্য অফিসেও এরকম অসাধু কর্মচারি সক্রিয়ভাবে জড়িত আছে। তাদেরকেও চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এভাবে ভুয়া তথ্য দিয়ে জন্ম নিবন্ধন এবং এই জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটেই এনআইডি, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্র ইস্যু করা হচ্ছে যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। আসামিদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
একাত্তর/এআর
