গত এক বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ৬৪৫টি ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। তার মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পেয়েছে পুলিশ।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে সরকারপ্রধানের দপ্তর বলছে, বাকি ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয়, বরং ‘সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত’। এর মধ্যে রয়েছে-
- পাড়া-মহল্লার বিরোধ,
- জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব,
- রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা,
- চুরি, যৌন সহিংসতা এবং
- ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো ঘটনা।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পুলিশের নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, সব তথ্য যাচাই করা ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), জেনারেল ডায়েরি (জিডি), চার্জশিট এবং সারাদেশের তদন্ত অগ্রগতির ভিত্তিতে পাওয়া গেছে।
এতে বলা হয়েছে, পর্যালোচনায় মোট ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে, আর ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রধানত ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিলো, পাশাপাশি অল্পসংখ্যক অন্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত।
গেলো ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র বর্মণকে পিটিয়ে হত্যা করে তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শুরুতে এটিকে ‘হিন্দু নির্যাতন’ বলা হলেও পুলিশ জানায় অফিস রাজনীতিতে শিকার দীপু।
অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে প্রভাবিত করে এমন অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, অন্য যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ, জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত ঘটনাও রয়েছে।
সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে মন্দির ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে চুরি, হত্যাকাণ্ড এবং প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্টের মতো ৭১টি ঘটনা রয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, সাম্প্রদায়িক উপাদানযুক্ত ৭১টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ধর্মীয় স্থাপনা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা। এর মধ্যে-
- মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ৩৮টি।
- মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি।
- মন্দিরে চুরির ঘটনা ছিল একটি।
- একটি হত্যাকাণ্ডও সাম্প্রদায়িক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অন্য ২৩টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে-
- প্রতিমা ভাঙার হুমকি,
- সোশাল মিডিয়ায় উসকানিমূলক পোস্ট এবং
- পূজামণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো ঘটনা।
এসব ঘটনায় পুলিশ ৫০টি মামলা নথিবদ্ধ করেছে, গ্রেপ্তার করেছে ৫০ জনকে। পাশাপাশি ২১টি ঘটনায় অন্য ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য দিয়েছে সরকারপ্রধানের দপ্তর।
পুলিশের তথ্যের বরাতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, ২০২৫ সালের সংখ্যালঘুদের ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে-
- প্রতিবেশী বিরোধ (৫১টি),
- জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব (২৩টি),
- চুরি (১০৬টি),
- পূর্ব শত্রুতাজনিত ঘটনা (২৬টি),
- অস্বাভাবিক মৃত্যু (১৭২টি) এবং
- ধর্ষণের ঘটনা (৫৮টি)।
এছাড়া ‘অন্য’ ১৩৮টি ঘটনা রয়েছে, যেগুলো অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এসব ঘটনায় ৩৯০টি নিয়মিত মামলা এবং ১৫৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা নথিভুক্ত নথিবদ্ধ করেছে পুলিশ। পদক্ষেপ হিসেবে ৪৯৮ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৩০টি ঘটনায় বিভিন্ন ধরনের পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি অপরাধের ঘটনাই উদ্বেগজনক হলেও, তথ্য-উপাত্তের প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। যা একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নির্দেশ করে, অন্যদিকে ভীতি বা বিভ্রান্তির বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
