বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি ভেঙে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে শপথ নিতে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। একই দিনে শপথ নেবেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যরাও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এই অভিষেক অনুষ্ঠানকে ঘিরে পুরো সংসদ ভবন এলাকায় এখন সাজ সাজ রব।

মঙ্গলবারের এই মেগা ইভেন্টটি মূলত দুটি প্রধান পর্বে অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্য শপথ নেবেন। তাদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। এমপিদের শপথের পরপরই তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।
এরপর বিকেল চারটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পাঠ করাবেন।

শপথের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে সংসদীয় দলের বৈঠক করবে বিএনপি। এই বৈঠকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সংসদ নেতা’ নির্বাচিত করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকেই নতুন সরকারের রূপরেখা ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রাথমিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে সাধারণত বঙ্গভবনেই নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রথম অস্থায়ী সরকার এবং ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম মন্ত্রিসভা বঙ্গভবনে শপথ নিয়েছিল।

দীর্ঘ ৫৪ বছরের সেই প্রথা ভেঙে এবারই প্রথম সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংসদ ভবনে যে ভাঙচুর ও তাণ্ডব চলেছিল, সেই ক্ষত মুছে নতুন এক গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা করতে যাচ্ছে এই সংসদ ভবন।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে ১২০০ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও সার্কভুক্ত দেশসহ মোট ১৩টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে সংসদ এলাকায়।

অনুষ্ঠানস্থল ও পুরো সংসদ ভবন এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় নতুন করে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে র্যাব। ডিএমপির পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। দক্ষিণ প্লাজায় বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিন টিভি ও সাউন্ড সিস্টেম বসানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। ইলেকট্রিশিয়ানরা দিনরাত কাজ করছেন যাতে দূর থেকেও মানুষ অনুষ্ঠানটি পরিষ্কার দেখতে পায়।
সংসদ ভবন পরিদর্শনে এসে লক্ষ্মীপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, সংসদ দেশের মানুষের আমানত। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং তাদের অধিকার রক্ষাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। এই শপথ গ্রহণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ, এখানে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করবে।
সার্বিকভাবে, সোমবার সকাল থেকেই সংসদ ভবন এলাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান ও রংমিস্ত্রিদের কর্মব্যস্ততা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর মহড়ায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অভিযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে যাচ্ছে।
চরমোনাই পীরের সঙ্গে তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ