মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন এক দীর্ঘ আরাধনা, যাদের শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে ওঠে সৃষ্টির সুর। তারা পৃথিবীতে কেবল নিজের জন্য আসেন না, তারা জন্ম নেন বিশ্বকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তাদের অস্তিত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিল্প আসলে কোনো ক্ষণস্থায়ী বিনোদন নয় বরং আত্মার মুক্তির পথ, ঈশ্বর-সন্ধানীর ধ্যান। সেই মহাসাধকদের কাতারে দারুণভাবে উচ্চারিত এক নাম—সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তিনি শুধু একজন সেতারশিল্পীই নন, তিনি ছিলেন এক মহাজাগতিক সাধক - যার হাতে সুর পেয়েছিলো মুক্তির ডানা, যার অন্তরে সঙ্গীত হয়ে উঠেছিল মানুষের বেদনা ও আনন্দের সমবেত প্রার্থনা।
আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার মাটিতে যখন ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড়ে সমাজ বিপন্ন, তখনই ১৮৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামে (মাইজদি কোটালীপাড়া) জন্ম নিয়েছিলেন এই মহাগুরু। পরিসংখ্যান বলে, সেই সময় বাংলার মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতো। কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁর সাধনা প্রমাণ করে যে, জ্ঞানের আলো কোনো পরিসংখ্যানের অধীন নয়। তার জন্মকালীন সমাজ ছিল সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন, কিন্তু প্রতিকূলতার মাঝেই জন্ম নেয় মহান সাধনা। শৈশবের দারিদ্র্য, অনটন ও অবহেলাকে অতিক্রম করেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অনমনীয় আত্মা, যে আত্মা আজও সংগীতের প্রতিটি তারে প্রতিধ্বনিত হয়। স্থানীয় সংগীত শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে তিনি পা বাড়ান কলকাতার সঙ্গীতাঙ্গনে, যেখানে বাংলার সুরসাধক গোপাল চন্দ্র চক্রবর্তী (গোকুল নাথ) এবং রামপুরের উস্তাদ ওয়াজির খাঁ প্রমুখ গুরুদের সান্নিধ্যে তাঁর সাধনা পেল দৃঢ় রূপ। দিনে আঠারো ঘণ্টার কঠোর রেওয়াজ তাকে দিয়েছিল মজবুত ভিত, কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁ নিজের সাধনার মধ্য দিয়েই নির্মাণ করেছিলেন স্বতন্ত্র এক সুরলোক।
তিনি কেবল একজন দক্ষ বাদকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নবস্রষ্টা। সেতারের তার, সারোদের গভীরতা, বাঁশির নিশ্বাস কিংবা পাখোয়াজের ধ্বনি—সবকিছুতেই তিনি আনতেন নিজস্ব ব্যঞ্জনা। গবেষণায় দেখা যায়, তিনি দুই হাজারেরও বেশি রাগ-রাগিণী সৃষ্টি করেছিলেন, যার মধ্যে একশত বিশটি সম্পূর্ণ নতুন রাগ হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিটি রাগ ছিল তাঁর আত্মার ধ্যান থেকে জন্ম নেওয়া নতুন কবিতা।
হেমন্ত রাগে ধরা পড়ে শীতের নিস্তব্ধ বিষণ্নতা, ললিত পঞ্চমে লুকানো থাকে ভোরের মৃদু আশ্বাস, আর শিবমত ভৈরবে অনুভূত হয় এক গম্ভীর আধ্যাত্মিকতা। ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিটি রাগ দিব্য প্রকাশের প্রতীক—যেখানে শব্দ হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের বাহন। তার এসব সৃষ্টি থেকে বোঝা যায়, আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত কেবল কৌশল ছিল না, বরং ছিল মহাজাগতিক সত্যের অনুসন্ধান।
তার গড়ে তোলা মাইহার ঘরানা আজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অমর ঐতিহ্য। পরিসংখ্যান বলে, তার সরাসরি শিষ্য ছিলেন পঞ্চাশেরও বেশি, যাদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত সেতারশিল্পী রবিশঙ্কর, বিশ্বমানবতার সেতারবাদক আলী আকবর খাঁ, সুরসাধনায় নিবেদিতা কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী—সবাই তার সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তার শিষ্যরা পরবর্তীতে পনেরোটি দেশে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রচার করেছেন। তাদের প্রতিটি সুরের ভেতর আজও বাজে গুরু আলাউদ্দিন খাঁর নিশ্বাস। তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষ, যিনি নিজের মহিমাকে কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং শিষ্যদের আলোকিত করে তাঁদের মধ্য দিয়েই নিজের উত্তরাধিকার বিস্তার করেছিলেন। পশ্চিমের সঙ্গীতজগতে বিথোফেন বা বাখ যেমন তাদের সিম্ফনির মাধ্যমে মানবজাতির কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন, তেমনি আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুবতারা, যিনি শিষ্যদের মধ্যে আলোকিত হয়েই অমরত্ব লাভ করেছেন।

তার জীবনদর্শন ছিল অনন্য এবং গভীর দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলতেন, ‘সঙ্গীত হল নাদ ব্রহ্মের ধ্যান’—যেখানে শব্দ হয়ে ওঠে অতীন্দ্রিয় বাস্তবতা। তার মতে প্রতিটি সুর ব্রহ্মাণ্ডের সাথে আমাদের সংযোগ স্থাপন করে, যা আদি শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই ধারণায় ব্যক্তির আত্মা পরমাত্মার সাথে মিলিত হয়। কষ্টকে তিনি দেখতেন সৌন্দর্যের জন্মদাতা হিসেবে, যেমনটি দেখি রূপান্তরের আলোকিত প্রক্রিয়ায়। দীর্ঘ অভাব, কঠোর পরিশ্রম, কঠিন আত্মসংযম—এসবই তার জীবনে সুর হয়ে ধ্বনিত হয়েছিল। তার জীবন আমাদের শেখায়, শিল্পের সাফল্য কেবল প্রতিভার মাধ্যমে আসে না, বরং অবিরাম সাধনা, ত্যাগ আর আত্মশাসনের মাধ্যমে আসে।
১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দৈহিকভাবে তিনি যখন পৃথিবীর মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন, তখন মনে হয়েছিল যেন সুরের মহাসমুদ্র থেকে এক অনন্ত তরঙ্গের অবসান ঘটল। কিন্তু মহান আত্মার মৃত্যু নেই। গুগল আর্টস অ্যান্ড কালচারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর তার জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে দুইশতেরও বেশি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
ইউনেস্কোর রেকর্ড বলে, তার সৃষ্ট রাগসমূহ বর্তমানে চল্লিশটিরও বেশি দেশে অধ্যয়ন করা হয়। আলাউদ্দিন খাঁর সুরেলা আত্মা আজও বিরাজ করে প্রতিটি রাগ-রাগিণীর হৃদ্স্পন্দনে, প্রতিটি সেতারের তারে তারে অনুরণিত সৃষ্টিসুখে। তিনি রেখে গিয়েছেন এমন এক দীপস্তম্ভ, যার আলোয় আজও পথ খুঁজে পায় অসংখ্য সুরসাধক।
তার বিশ্বাস ছিল যে, সঙ্গীত শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে এক চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় মানুষকে। ভারতীয় দর্শনের মীরাবাঈয়ের ভক্তিমূলক গান থেকে বাখের ক্যান্টাটা পর্যন্ত—সর্বত্র আমরা এই সার্বজনীন সত্য দেখতে পাই। তাঁর সমগ্র জীবনই ছিল সেই সত্যের অন্বেষণে এক তপস্যা, যেখানে নিরলস সাধনা, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে শিল্পী হয়ে ওঠেন মহামানব, আর সৃষ্টি হয়ে ওঠে মহাবিশ্বের সাথে এক আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন। তাই আজও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির অমরত্বে, প্রতিটি শিষ্যের হৃদয়ে জ্বলজ্বলে অগ্নিশিখার মতো। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কেবল একজন শিল্পী নন। তিনি সঙ্গীতের এক জীবন্ত দর্শন, এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, যার আলো কখনোই ম্লান হওয়ার নয়। তিনি দার্শনিক প্লেটোর বর্ণনায় ‘সৌন্দর্যের চিরন্তন রূপ’ এর মতো—যা সময়, স্থান ও শারীরিক অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে।
আলো-অন্ধকারের দার্শনিক জহির রায়হান