রোহিঙ্গা সংকট: মানবিকতা দিয়েই কি সমাধান সম্ভব?

 

 

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:১১ পিএম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ইতিহাস শত শত বছরের পুরোনো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজ দেশেই বৈষম্য, নিপীড়ন এবং নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে অধিকাংশ রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব হারিয়ে কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে তারা ভোটাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন নতুন নয়। ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২ এবং ২০১৭ সালে বড় আকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান ও সহিংসতার কারণে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সরকার, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ও অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করেছে।


বাংলাদেশের এই মানবিক উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জন্য একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারে শরণার্থী শিবির নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ বনভূমি উজাড় করতে হয়েছে। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। মাটিক্ষয়, পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং জ্বালানি সম্পদের সংকট স্থানীয় পরিবেশকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। যদিও সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তবুও ক্ষতির পরিমাণ উদ্বেগজনক।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের ফলে মানবপাচার, মাদক পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেও কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের ব্যয় প্রায় ১.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। এছাড়া স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি স্থানীয় জনগণের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তবে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি বোঝা বহন করা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।


এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। UNHCR, WFP এবং UNICEF খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয় ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, মানবিক সহায়তা দিয়েই কি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব?

এর উত্তর হলো, না। মানবিক সহায়তা রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষায় অপরিহার্য হলেও এটি সংকটের মূল কারণ সমাধান করতে পারে না। রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নাগরিকত্বহীনতা, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু ত্রাণ ও সহায়তার মাধ্যমে সংকট দীর্ঘায়িত হবে, কিন্তু সমাধান হবে না।


তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিকে মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনা করা এবং রাখাইনে একটি নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জটিল মানবিক সংকট। বাংলাদেশ মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু এই সংকটের বোঝা অনির্দিষ্টকাল বহন করা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রধান লক্ষ্য।

লেখক ড. নার্গিস বানু অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পরিবেশ বিষয়ক পেশাজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

এআরএস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান এক নতুন ধারার প্রবক্তা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাই পরিচালনা করছেন না, বরং তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে...
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অঞ্চলে হাম রোগের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হলেও, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে...
উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক বিষয় ও চলমান প্রক্রিয়া। দেশ-কাল ভেদে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন পর্যায়ের সাথে সাথে এই মাত্রারও পরিবর্তন হয়। যেমন, ১৯৩০ এর দশকে ব্রিটেনে উন্নয়ন দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিলো...
বাংলাদেশের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া গণতন্ত্র, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, মানুষের অধিকার, দেশের অবকাঠামো আবার ফিরে পেল তার রূপ, সর্বত্র উন্নয়নের কাজ শুরু হল।
একটি সুস্থ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের...
সুনামগঞ্জে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে হাওরে ঝড়ের কবলে পড়ে ডিঙি নৌকা ডুবে এক পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আরও তিনজন।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে দেশের বন্দরগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যা খুব শিগগিরই কার্যকর হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক...
রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পাওয়া বোমা সদৃশ বস্তুর কারণে সৃষ্টি হওয়া আতঙ্ক দূর করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিত্যক্ত...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর