পদ্মা সেতুকে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির প্রাণ ভোমরা বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেন, পদ্মাসেতু এখন বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকের এগিয়ে না আসার উপযুক্ত জবাব আজকের পদ্মাসেতু।
শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে তারা এসব কথা জানান। পদ্মা সেতু নিয়ে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটি আয়োজিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
‘শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু নির্মাণ: বিশ্ব ব্যবস্থায় বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল দেশসমূহের এক যুগান্তকারী বিজয়’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয় এই সেমিনার। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ।
সেমিনারে ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেছেন, সারাদেশে যে যোগাযোগ বিস্তৃত হলো সেটা আমরা জানি। অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে। অনেক শিল্প সৃষ্টি হবে। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। মোংলা বন্দর, বেনাপোল বন্দর রয়েছে। সেগুলো আগের তুলনায় বেশি ব্যবহার হবে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে। আমাদের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা হয়েছে, এটা আমাদের মর্যাদার বিষয়। কারণ পদ্মা সেতুর মতো এত বড় প্রকল্প আমাদের নিজেদের অর্থায়নে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় করতে পেরেছি। পদ্মা সেতুর টোলকে যৌক্তিক হিসাবেও বর্ণনা করেন তিনি।
আর পানি সম্পদ ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক যে বিরোধিতা করেছে, তার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিলো। যমুনা সেতু যারা করেছে, আমরা তাদের প্রি-কোয়ালিফাই করিনি। কারণ পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো সক্ষমতা তাদের ছিলো না।

পদ্মা সেতুর মান বজায় রাখার বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হয়নি জানিয়ে আইনুন নিশাত বলেন, যত ধরনের দুর্যোগ হতে পারে সেসব সব মাথায় রেখেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পদ্মা সেতুর মান নিয়ে কোনো আপোষ করা হয়নি। আমি এটির নির্মাণ কাজের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলাম। তাই আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলতে পারি।
আইনুন নিশাত বলেন, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র দুই নদ–নদীর মিলিত শক্তি হচ্ছে পদ্মার। প্রতি সেকেন্ডে এই নদীর পানি ১৫ ফুট পর্যন্ত এগিয়ে যায়। পদ্মা নদীতে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে। কত জোরে আঘাত হানতে পারে, সেগুলো প্রতিহতে মতো সক্ষমতা তৈরি করেই সেতু নির্মাণ করেছি।
সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় হয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়। মূল্যস্ফীতি ও নির্মাণকাজের সময় অতিরিক্ত কাজ যুক্ত হওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে ওই সময়ে প্রকল্পের যে ব্যয় ধরা হয়েছিল সেই টাকাতেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় হয়নি।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে, বহু সময় অবকাঠামোগত প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো জটিল নদী ব্যবস্থায় প্রকল্প আগামী এক-দেড় শ বছরেও হবে না। বিশ্বব্যাংক এ রকম একটি বড় ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রকল্প থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছে, আমরা বঞ্চিত হইনি।
তিনি বলেন, দুর্নীতির অনুমান নির্ভর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। তবে এ সরে যাওয়ায় বাংলাদেশের লাভ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণের ভেতর যে আত্মিক সম্পর্ক সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি টাকাপয়সার হিসাবের চেয়ে অনেক বড়।
পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের বিজয় ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান অতিথি স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, পদ্মা আমাদের কাছে ইট-পাথরে নির্মিত একটি সেতু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো-কোটি বাঙালির আবেগ, আমাদের ভালোবাসা, গৌরব।
গত ১০ বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে পদ্মা সেতুর প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্পিকার।
একাত্তর/এসি
