রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় একটি তিনতলা ভবনে বিস্ফোরণ ও আগুনে তিনজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। রোববার (৫ মার্চ) বেলা ১১টার কিছু আগে ভবনটিতে বিকট বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। ধসে পড়ে তিনতলার আংশিক দেয়াল। তবে, ঠিক কী কারণে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তা এখনও জানা যায়নি।
ভবনটিতে কী ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে তা খুঁজতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিস্ফোরণস্থলসহ ভবনের প্রতিটি তলায় অভিযান চালানো হয়েছে। বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণ জানতে তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
শিরিন ম্যানশন নামে ভবনটির তিন তলায় ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিস রয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কিছু ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে ভবনটির বিভিন্ন তলায়। বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনার পর সেখানে গেছে বোম ডিসপোজাল ইউনিট।
বোম ডিসপোজাল ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, এসি, সিলিন্ডার নাকি অন্য কিছুর বিস্ফোরণ ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে সিআইডিসহ অন্য সংস্থার এক্সপার্টরাো উপস্থিত আছেন, এখানে তারাও কাজ করছেন।

ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, এসি বিস্ফোরণ থেকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট বলছে, স্যুয়ারেজ বা গ্যাস লাইন থেকে আসা গ্যাস ভবনের ভেতরে জমে এই বিস্ফোরণ হতে পারে। সেনা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটিও ঘটনাস্থলে কোনো বিস্ফোরকের আলামত পায়নি।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ কেঁপে ওঠে পুরো সায়েন্সল্যাব এলাকা। এ সময় আতঙ্কে দিগ্বদিক ছোটাছুটি করছিলো মানুষ। শিরিন ম্যানশন ভবনটির তিন তলায় থাকা ফিনিক্স ইন্সুরেন্সের একটি শাখা অফিসে ঘটে এই বিস্ফোরণ। সেটিই সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিস্ফোরণের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারও। বিস্ফোরণে ধাক্কায় ভবনের জানালার কাঁচ-ইটসহ বিভিন্ন জিনিস উড়ে এসে রাস্তায় পড়ে। পুরো এলাকা যেন পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। রাস্তায় পথচারীদের পড়ে থাকতে দেখা যায়। উপস্থিত জনতাই প্রথমে উদ্ধার কাজ শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সদস্যরা জানান, বিস্ফোরণের কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো এলাকায় গ্যাসের তীব্র গন্ধ ভেসে আসে। তিনতলা এই ভবনটির নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় বেশ কয়েকটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এছাড়াও এর পাশেই সুউচ্চ আবাসিক ভবন ও প্রিয়াঙ্গন শপিংমল রয়েছে।
বিস্ফোরণ কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে আসে ফায়ার সার্ভিস। অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আসে বিস্ফোরণের পর লাগা আগুন। বিস্ফোরণে শফিকুজ্জামান, আব্দুল মান্নান ও তুষার নামের তিনজন মারা যান। আহত ১৫ জন ঢাকা মেডিক্যালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ভবনের তিনতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবন থেকে ইট ও জানালার কাচ উড়ে গিয়ে রাস্তা ও আশপাশের এলাকায় পড়েছে। তিনতলা ওই ভবনে বেশির ভাগই কাপড়ের দোকান ছিল। আশপাশে বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন রয়েছে। সেখান থেকে মানুষ আতঙ্কে নিচে নেমে এসেছেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দুপুরে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরণের কারণ বলা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে চার কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। শর্ট সার্কিট, জমে থাকা গ্যাস বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং এসি বিস্ফোরণও হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সঠিক কারণটি বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে এই মুহূর্তে ভবনটিতে কারও প্রবেশ করা উচিত হবে না। ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ঘুরে এসেছে ও পরিদর্শন করেছে। ভবনটির অবস্থা এখন পর্যন্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; ভবনের অবস্থা ভালো নয়।
এদিকে, রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকার তিনতলা একটি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই বছর আগে মগবাজার এলাকার একটি ভবনে ঘটা বিস্ফোরণের মিল খুঁজে পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।
রোববার দুপুরে সায়েন্স ল্যাব এলাকার শিরিন ভবনের বিস্ফোরণস্থল দেখতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ও সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল দলের প্রধান রহমত উল্লাহ চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছে এমন কথা জানান।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে সায়েন্স ল্যাব এলাকার ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ২০২১ সালে ঘটে যাওয়া মগবাজারের বিস্ফোরণের মতো গ্যাস থেকে সৃষ্ট। ভবনটিতে কোনো না কোনোভাবে গ্যাস জমে ছিলো।
তিনি আরও যোগ করেন, জমে থাকা গ্যাসের ঘণমাত্রা যদি ৫-১১ মাত্রার এবং এটা যদি ট্রিগার হয় তাহলে এই ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। এই ট্রিগার সুইচের মাধ্যমে, ফ্যানের সুইচ ও এসির সুইচের মাধ্যমেও হতে পারে। এটা গ্যাস থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণ হতে পারে। আর এতো বড় বিস্ফোরণ গ্যাস থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে।
রহমত উল্লাহ বলেন, আমাদের নগরবাসীকে সচেতন থাকতে হবে, বৈদ্যুতিক সুইচ ও গ্যাসের চুলা জ্বালানোর আগে দরজা-জানালা খুলে যেন কক্ষ থেকে গ্যাস বিতাড়িত করা হয়। ভবনটিতে কীভাবে গ্যাস জমে ছিলো- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখানে যে কোনোভাবে গ্যাস জমা হয়ে থাকতে পারে। সেটা সুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমেও হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৭ জুন রাজধানীর মগবাজারের বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় ১২ জনের। ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকা কেঁপে উঠেছিল। বেশ কয়েকটি ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। রোববার সায়েন্স ল্যাবের বিস্ফোরণেও কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। এ ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ১৫ জন আহত। তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর।
অন্যদিকে সায়েন্স ল্যাব এলাকার শিরিন ম্যানশনে বিস্ফোরণ ঘটনায় কোনো ধরনের বিস্ফোরকের আলামত খুঁজে পায়নি সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত দুইটি দল।
রোববার বিকাল সোয়া তিনটার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনার কারণ খুঁজতে সেনাবাহিনীর কেমিক্যাল ডিজাস্টার রেসপন্স টিম (সিডিআরটি) ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের দুটি আলাদা দল শিরিন ভবনে আসে। বিশেষায়িত এই দু’দলের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে দেখেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সেনাবাহিনীর ৫৭ ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানি কমান্ডিং অফিসার মেজর মো. কায়সার বারী। তিনি বলেন, বারুদ বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থের নমুনা পাওয়া যায়নি। বোমা সাদৃশ্য কিছু নেই। কোনো ধরনের বোম বা আইডি পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, আমরা মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য। আমরা প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ যন্ত্রণ দিয়ে ঘটনাস্থলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি।

মেজর কায়সার বলেন, প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণের পরে আমরা বুঝতে পারি এ বিস্ফোরণের ঘটনায় বিস্ফোরকের মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি। যদি বিস্ফোরণের ঘটনায় কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করা হতো তাহলে আমাদের যন্ত্রের মাধ্যমে বুঝতে পারতাম।
সেনাবাহিনীর এই কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু আমরা প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরক ব্যবহারের কোনো আলামত পাইনি সেহেতু আরও তদন্ত শেষে পরবর্তীতে জানা যাবে বিস্ফোরণটি আসলে কেন ঘটেছে। বিস্ফোরণটি কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা যে কোনো ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানার জন্য আমাদের আরও তদন্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যেহেতু বিস্ফোরক শনাক্ত করি যন্ত্র দিয়ে, তাই প্রাথমিকভাবে আমরা বলতে পারি এখানে বিস্ফোরকের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বারুদ বা আইইডি ব্যবহারের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বিস্ফোরণের আসল কারণ আরও তদন্ত শেষে পরে জানা যাবে।
আর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছেন, রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বিস্ফোরণের পর একটি ভবনের আংশিক ধসে তিনজনের প্রাণহানি কোনো নাশকতার ঘটনা নয়, একটি দুর্ঘটনা।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আগুন নিয়ন্ত্রণে, পুড়লো ১১ নম্বরের সব ঘর
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে কোনো নাশকতার আলামত পাওয়া যায়নি এবং বিভিন্ন কারণে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এটি তদন্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিস্ফোরণ তদন্তের জ কমিটি গঠন করবো এবং তদন্ত সংস্থা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেবে এবং একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্প্লিন্টার বা ধ্বংসাত্মক উপাদানের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি প্রধান বলেন, তারা এখনও তেমন উপাদানের চিহ্ন খুঁজে পায়নি।
একাত্তর/এসি
