মরুর বুকে তীব্র গরম আর প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো হাজি। মঙ্গলবার পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে মক্কার ঐতিহাসিক মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা প্রদান করা হয়েছে।
এবার হজের এই তাৎপর্যপূর্ণ খুতবা দেন মসজিদে নববির সম্মানিত ইমাম শেখ আলী আল-হুদাইফি। খুতবায় তিনি বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।

পবিত্র খুতবায় শেখ আল-হুদাইফি হজের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "হজ হলো ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ, যার মূল ভিত্তিই হলো মহান আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, হজ কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন জাতি, দেশ ও বর্ণের মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক চেনা-জানা, গভীর সম্প্রীতি, সহযোগিতা এবং একতা গড়ে তোলার এক অনন্য মিলনমঞ্চ।
ইমাম তাঁর বক্তব্যে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জনের আহ্বান জানান এবং মুমিনদের জন্য আল্লাহর সাহায্যের চিরন্তন বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হজের পবিত্রতা রক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তম আচরণ ও সত্য কথা বলার মাধ্যমেই হজের পূর্ণতা আসে। একই সাথে তিনি হাজিদের সব ধরনের গুনাহ, ঝগড়া-বিবাদ এবং হজের ময়দানে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা দলীয় স্লোগান দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার কড়া নির্দেশনা দেন।
খুতবা প্রদান শেষ হওয়ার পর ইমাম শেখ আলী আল-হুদাইফি আল্লাহর দরবারে এক আবেগঘন মোনাজাত পরিচালনা করেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে হাজিদের হজ কবুল করার জন্য দোয়া করার পাশাপাশি তিনি বলেন, হে আল্লাহ, আপনি মুসলিমদের অবস্থার উন্নতি করুন। তাঁদের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে দিন এবং তাঁদের সত্যের পথে পরিচালিত করুন।

মোনাজাতে হাজিরা যেন সুস্থ ও নিরাপদে নিজ নিজ দেশে আপনজনদের কাছে ফিরে যেতে পারেন, সেই প্রার্থনাও করা হয়। খুতবা ও মোনাজাত শেষে হাজিরা সুন্নাহ অনুযায়ী ঐতিহাসিক মসজিদে নামিরায় একই সাথে জোহর ও আসরের নামাজ (কসর) আদায় করেন।
ইসলামের ইতিহাসে মক্কার জাবালে রহমত (রহমতের পাহাড়) এবং মসজিদে নামিরা অন্যতম প্রধান পবিত্র নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই ৭০ মিটার উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়েই মানবজাতির মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।
প্রতি বছরের মতো এবারও হাজিরা ভোরবেলা থেকে সাদা ইহরাম পরিহিত অবস্থায় এই পবিত্র পাহাড়ে অবস্থান নেন এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করেন। নামিরা পাহাড়ের নামানুসারে তৈরি এই মসজিদটি মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফার মতো হজের পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ।

এদিকে, হাজিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবার সৌদি আরবের পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক আধুনিকায়ন দেখা গেছে। মক্কা জেনারেল ট্রান্সপোর্ট সেন্টার জানিয়েছে, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে এবার পবিত্র হজের দিন সকাল ৭টা ৫৬ মিনিটের মধ্যেই সব হাজির আরাফাতের ময়দানে পৌঁছানোর কাজ সম্পন্ন হয়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই ঘণ্টা দ্রুত হয়েছে। হাজিদের এই বিশাল বহরকে নিরাপদে আনা-নেয়ার জন্য শাটল বাস, যানবাহনের পাশাপাশি আধুনিক আল মাশায়ের আল মুকাদ্দাসাহ মেট্রোরেল ব্যবহার করা হয়েছে, যা হাজিদের চরম গরমের মধ্যেও স্বস্তি দিয়েছে।
