একাধিক তারকা প্রার্থীর আসন মাদারীপুর-৩। এখানে কোন দল জিতবে সেটা এই আসনের আলোচনা নয়। মূল আলোচনা হচ্ছেন পদ্মা পাড়ের এই আসনের প্রার্থী কে হতে যাচ্ছেন? ১৯৯১ থেকে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন প্রার্থী এখানে জেতেনি। ভোটের পার্থক্যও অনেক। দুর্বল বিএনপিতেও এখানে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত, প্রার্থীও অনেক। যদিও দলটির নেতারা বলছেন, মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু শত্রুতা নেই। তবে এখন তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে আছেন।
পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগের ছাপ পড়েছে সদরের পাঁচ ইউনিয়ন, কালকিনি এবং নবগঠিত ডাসার উপজেলা নানা এলাকায়। বদলে গেছে রাস্তাঘাট। মানুষের আয়ও বেড়েছে অনেক। ভোটাররা বলছেন বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব তারাই নেবেন। ফলে এই আসনে নৌকাকে টলানো সহজ হবে না।
আওয়ামী লীগের শক্তিশালী দুর্গের নাম মাদারীপুর-৩ আসন। এ আসনে রেওয়াজ আছে- যিনি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা পাবেন, তিনিই জাতীয় নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ী। রাজনীতির পালাবদলের অনেক দুঃসময়েও এই আসনের ভোটাররা আওয়ামী লীগকে কখনো নিরাশ করেনি।
মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের আলোচনায় ছিলেন তিন হেভিওয়েট। বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ, সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং আসনের সাবেক এমপি কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিন জনের মধ্য সৈয়দ আবুল হোসেন ২৪ অক্টোবর রাতে মারা গেছেন।
ফলে এখন এই আসনে কার্যত নৌকার মাঝি হওয়ার লড়াইয়ে ঠিকে থাকলেন দুই জন। দুইজনেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি-তর্কে আছেন তাঁদের অনুসারীরা। নেতা-কর্মীরা বলছেন, প্রার্থী মনোনয়নের জন্যে এলাকায় কাজ এবং তৃণমূলের অবস্থানের ওপর জোর দেয়া উচিত। তবে যিনি নৌকা পাবেন তার সঙ্গেই থাকবেন তারা।
বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী সৈয়দ আবুল হোসেন এখান থেকে একটানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রীও ছিলেন। দীর্ঘদিন এই আসনে একক নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন আবুল হোসেন। তার মৃত্যুতে বিরাট শূন্যতা তৈরি হলেও, এখন আলোচনায় থাকবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা বাহাউদ্দিন নাসিম এবং বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম এবার জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। ২০১৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাঁর অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করে যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অবদান রেখেছেন। এলাকায় তার নিজস্ব অনেক ভক্ত ও অনুসারীও রয়েছে।
বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আমার প্রতি এ আসনের সাধারণ জনগণের ভালোবাসা, দোয়া ও সহানুভূতি আছে। তাই যদি আমাকে দল পুনরায় মনোনয়ন দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করব। তবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। তা মেনে নিয়ে কাজ করে যাব।
এই আসনের আরেক শক্তিশালী প্রার্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ। এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্রিজ, রাস্তা, কালভার্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন করেছেন তিনি। নির্বাচন নিয়ে আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ বলেন, নৌকার সাথে বেইমানি করা যাবে না। তাই এই আসনে নৌকার মনোনয়ন যে পাবেন, আমরা তাঁর নির্বাচনই করব।
অন্যদিকে, এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাশুকুর রহমান মাশুক ও কেন্দ্রীয় সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সহ-সম্পাদক আনিচুর রহমান তালুকদার খোকনের নাম শোনা যাচ্ছে। এ দুই নেতা এলাকায় জনসংযোগ ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। সব মিলিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০০১ সালের মত নির্বাচনেও এই আসনে বিএনপি প্রার্থী, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে পাঁচগুণ কম ভোট পেয়েছিলেন। তার পরেও এখানে বিএনপি একাধিক গ্রুপ রয়েছে। যদিও তারা এখন সরকার পতনের আন্দোলনে মাঠে। বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলে এবার তারাই জয়ী হবেন।
এদিকে, জাতীয় পার্টির (জাপা) নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ খালেক খোকন এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি। তবে জোটগতভাবে নির্বাচন না হলে আমি জাপার প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।
মাদারীপুর-৩ এই আসনে উপজেলা জামায়াতে ইসলাম ও জাতীয় পার্টির তেমন কোন প্রচার প্রচারণা ও দলীয় কার্যক্রম নেই। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা গোপনে প্রচার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দলীয় প্রার্থী কে হবেন এ ব্যাপারে নেতাকর্মীরা মুখ খুলছে না।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালকিনি ও ডাসার উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং মাদারীপুর সদরের পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-৩ আসনে মোট ভোটার রয়েছে তিন লাখ ৯১ হাজার ২২৬ জন। ভোটারদের কমপক্ষে ৮০ ভাগই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সমর্থক।
এআরএস
মাদারীপুর-১: নৌকায় লিটনের বিকল্প নেই, বিএনপিতে বিভক্তি
মাদারীপুর-২: শাজাহান না নাছিম, কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি