ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলেরই অতীত ইতিহাস কেবলই হারের বৃত্তে বন্দি ছিল। তবে চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘গ্রুপ বি’-এর প্রথম ম্যাচেই সেই বৃত্ত ভেঙে ১টি করে পয়েন্ট ঝুলিতে পুরেছে কানাডা ও কাতার। এবার লক্ষ্য আরও বড়- বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয় ছিনিয়ে নেয়া।
বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় ভ্যানকুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে সহ-স্বাগতিক কানাডা ও এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি কাতার। মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে ফুটবল পণ্ডিত থেকে শুরু করে পরিসংখ্যান, সবাই কিন্তু স্বাগতিক কানাডাকেই স্পষ্ট ফেভারিট মানছে।

প্রথম ম্যাচে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করলেও মাঠের লড়াইয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল কানাডার। ৬১ শতাংশ বলের দখল, প্রতিপক্ষের বক্সে ৩৭ বার অনুপ্রবেশ আর ওপেন প্লে-তে বসনিয়াকে মাত্র ০.০২ এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) উপহার দেয়া, সব মিলিয়ে জেসি মার্শের দল ড্র করলেও ম্যাচটি তাদের জেতা উচিত ছিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, কাতারের গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুইজারল্যান্ডের মতো অভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে ১-১ গোলের ড্রটি কাতার ফুটবল ভক্তদের কাছে ছিল রূপকথার মতো। পুরো ম্যাচে মাত্র৩২ শতাংশ বলের দখল এবং প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র ৮ বার পা ছোঁয়াতে পেরেছিল কাতার। সুইসদের ৩.২ এক্সপেক্টেড গোলের ঝড়ের বিপরীতে ২৬টি শট হজম করেও কাতার ম্যাচটি ড্র করে মূলত ভাগ্যের জোরে, ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার মিরো মুহেইমের এক আত্মঘাতী গোলের কল্যাণে!

ভ্যানকুভারের দুর্গ ও কানাডার ওপর পাহাড়সম চাপ: ম্যাচে কানাডার ওপর চাপ থাকবে পাহাড়সম। টুর্নামেন্টের বাকি দুই সহ-স্বাগতিক মেক্সিকো এবং আমেরিকা নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ঘরের মাঠে দাপুটে জয় পেয়েছে, তাই কানাডাও চাইবে ঘরের মাঠে জয়ের উৎসবে যোগ দিতে। বিশ্বকাপে এর আগে ৭টি ম্যাচ খেলেও জয়ের মুখ না দেখা কানাডা যদি আজ না জিতে, তবে হোন্ডুরাস (৯ ম্যাচ) ও মিশরের (৮ ম্যাচ) পর টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়হীন থাকার লজ্জার রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে।
তবে ভ্যানকুভার শহরটি কানাডার জন্য এক দুর্গ। এই মাঠে নিজেদের শেষ ৪ ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে তারা, যেখানে গোল করেছে ১৭টি আর হজম করেছে মাত্র ২টি! এই মাঠে তারা শেষবার হেরেছিল ২০১৬ সালে, মেক্সিকোর কাছে।

লারিন-কোনে বনাম আকরাম আফিফ: প্রথম ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১২১ সেকেন্ডের মাথায় নিজের প্রথম টাচেই গোল করেছিলেন কাইল লারিন, যাতে অ্যাসিস্ট ছিল প্রমিজ ডেভিডের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কানাডার হয়ে দুই বদলি খেলোয়াড়ের এমন মেলবন্ধন এই প্রথম। ফলে লারিন শুরু থেকেই খেলার সুযোগ পেতে পারেন। এছাড়া মাঝমাঠের ইঞ্জিন ইসমায়েল কোনে আজ নিশ্চিতভাবেই থাকছেন, যিনি প্রথম ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৫০টি পাস ও ফাইনাল থার্ডে ৯টি লাইন-ব্রেকিং পাস দিয়ে কোচের বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন।
বিপরীতে কাতারকে লড়তে হবে তাদের রক্ষণভাগের কঙ্কালসার অবস্থা ঢাকতে। প্রথম ম্যাচে শট, পাস ও বল পজিশনে গ্রুপের সবার নিচে ছিল তারা। তবে কাতারের একমাত্র স্বপ্ন ও ভরসার নাম দুইবারের এশিয়ান বর্ষসেরা ফুটবলার আকরাম আফিফ। আল সাদের এই উইঙ্গারই প্রথম ম্যাচে কাতারের হয়ে একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

অতীত ইতিহাস ও পরিসংখ্যান: বিশ্বকাপের মঞ্চে এটিই এই দুই দলের প্রথম আনুষ্ঠানিক দেখা। তবে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েনায় এক প্রীতি ম্যাচে কাতারকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল কানাডা। এছাড়া ইতিহাসে এর আগে তিনবার বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ কোনো এশিয়ান দেশের মুখোমুখি হয়েছিল এবং তিনবারই স্বাগতিকরা (১৯৮৬ সালে মেক্সিকো, ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০১৮ সালে রাশিয়া) বড় ব্যবধানে জিতেছিল।
অপ্টা সুপারকম্পিউটারের রায়: অপ্টা সুপারকম্পিউটারের ২৫,০০০ সিমুলেশনের পর স্বাগতিক কানাডার জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে আকাশচুম্বী ৭২.৯ শতাংশ! ম্যাচটি ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ১৬.৫ শতাংশ এবং সব হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়ে কাতারের অলৌকিক জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১০.৬ শতাংশ। এখন দেখার বিষয়, ভ্যানকুভারের দুর্গে কানাডা তাদের প্রথম ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয়, নাকি আকরাম আফিফের কাতার আবারও ভাগ্যের জোরে বিশ্বকে চমকে দেয়!
