বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব এবার রূপ নিয়েছে দুই যুদ্ধরত দেশের মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক এক স্নায়ুযুদ্ধে। তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভিসা জটিলতার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে রোববার ভোরে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর টিজুয়ানায় এসে পৌঁছেছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। তুরস্কের তিন সপ্তাহের অনুশীলন ক্যাম্প শেষে একটি নৈশকালীন বিমানযোগে রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৫টার কিছু পরে সান ডিয়েগোর ঠিক ওপারে অবস্থিত এই মেক্সিকান শহরে অবতরণ করেন ইরানি ফুটবলাররা।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় ইরানি পতাকাধারী প্রায় ২০ জন ভক্তের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বাসের ভেতর থেকেই শুভেচ্ছা জানান ফুটবলাররা। এরপর মেক্সিকান পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ সশস্ত্র দল কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে দলকে বিমানবন্দর থেকে তাদের অস্থায়ী বেস ক্যাম্প হোটেল ম্যারিয়টে নিয়ে যায়।
ফুটবলকে ইরানে আক্ষরিক অর্থেই ধর্ম বা পরম ভালোবাসার স্থান হিসেবে দেখা হয়, যা দেশটির সমস্ত রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে। তবে এবার ইরানি দলের জন্য এই টুর্নামেন্ট ঘরের মাঠের অশান্ত রাজনীতি, আমেরিকার সাথে চলমান যুদ্ধ এবং মার্কিন মাটিতে আদৌ খেলতে পারবেন কি না, এমন তীব্র অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়েছে।

এমনকি তাদের টিজুয়ানায় অবস্থান করাটাও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত। মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবুল ফজল পসান্দিদেহ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে মার্কিন ভিসা পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা এবং দলের আমেরিকায় অবস্থান যতটা সম্ভব কম রাখার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের কারণেই অ্যারিজোনা থেকে বেস ক্যাম্প পরিবর্তন করে মেক্সিকোর এই সীমান্ত শহরে নিয়ে আসা হয়েছে।
জি-গ্রুপে থাকা ইরান তাদের প্রথম দুই ম্যাচ খেলবে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে; যেখানে ১৫ জুন নিউজিল্যান্ড এবং ২১ জুন বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে তারা। এরপর ২৬ জুন সিয়াটলে মিশরের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে ইরান। সমীকরণ অনুযায়ী, ইরান ও আমেরিকা দুই দলই যদি নিজ নিজ গ্রুপে রানার্স-আপ হতে পারে, তবে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর নকআউটে মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে এই দুই চিরশত্রু দেশ।
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ এমন একটি রাষ্ট্রকে স্বাগত জানাতে যাচ্ছে, যার সাথে তারা সরাসরি যুদ্ধ লড়ছে। তবে শুধু মার্কিন সংঘাত নয়, ঘরের মাঠের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ইরানি ফুটবলারদের জন্য এই বিশ্বকাপকে একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

গত বছরের শেষের দিকে ইরানে শুরু হওয়া সরকার বিরোধী তীব্র গণবিক্ষোভ দমনে প্রশাসনের কঠোর ক্র্যাকডাউনে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা। এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখনও চলমান।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক আব্বাস মিলানি বলেন, খেলোয়াড়দের জন্য পরিস্থিতি এখন ‘উভয় সংকট’ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। একদিকে দেশের জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশের চাপ, অন্যদিকে জাতীয় দল বয়কট করার সামাজিক চাপ, সব মিলিয়ে অ্যাথলেটরা শুধু ফুটবল খেলতেই এখানে এসেছেন, কিন্তু চারপাশের রাজনীতি তাদের পিষে ফেলছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দেশের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানি দল আন্তর্জাতিক মহলে যেমন প্রশংসিত হয়েছিল, তেমনি দেশের ভেতর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। মিলানির মতে, সেই সময়ের তুলনায় এবার খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ কয়েক গুণ বেশি।

ভিসা নাটক ও পেন্টাগনের কড়া বার্তা: দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার মাত্র ১০ দিন আগে গত শুক্রবার ইরানের সমস্ত খেলোয়াড়দের ভিসা মঞ্জুর করে ওয়াশিংটন। তবে খেলোয়াড়রা ভিসা পেলেও দলের প্রধান ম্যানেজার, নির্বাহী কর্মকর্তা ও টেকনিক্যাল স্টাফসহ প্রায় ১৫ জনকে ভিসা দেয়নি আমেরিকা।
ইরান ফুটবল ফেডারেশন একে স্বাগতিক দেশের দায়িত্ব লঙ্ঘন এবং ফিফা নিয়মের চরম অবমাননা বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পসান্দিদেহ নিশ্চিত করেছেন যে, রবিবার টিজুয়ানায় পৌঁছানো ৭০ সদস্যের ইরানি বহরের মধ্যে ১৫ জনের কাছে মার্কিন ভিসা নেই। এই বিষয়ে ফিফার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, অ্যাথলেট এবং অতি প্রয়োজনীয় সাপোর্টিং স্টাফদের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা ইস্যু করা হয়েছে। তবে পেন্টাগনের সুর ছিল বেশ কড়া; ওই কর্মকর্তা সোজা জানিয়ে দেন, ইরান দল যেন এই ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সন্ত্রাসী প্রবেশ করাতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত কঠোর।
এই চরম বৈরিতার মাঝে ইরান দলকে নিজেদের মাটিতে আশ্রয় দিয়ে মেক্সিকো সরকার এক দুর্দান্ত সহযোগিতার নিদর্শন দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক অভিবাসন প্রধান তোনাতিউ গুইলেন। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাইরে এত চাপ সামলে মেক্সিকোর সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকার মাঠে কেমন ফুটবল উপহার দেয় টিম ইরান!
