মাঠের ভেতরে ভিএআর ট্র্যাজেডিতে শেষ মুহূর্তের গোল বাতিল, আর মাঠের বাইরে বৈরী ভূরাজনীতি ও চরম লজিস্টিক অব্যবস্থাপনা, সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইরান দল যে নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে এবার বোমা ফাটালেন স্বয়ং দলের অধিনায়ক মেহেদি তারেমি।
মিশরের সাথে ১-১ গোলে ড্র করার পর সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভে ফাটলেন এই তারকা স্ট্রাইকার। ক্ষুব্ধ তারেমি সরাসরি ফিফাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ইরান দল আদৌ স্বাগত কি না, নাকি আমাদের টুর্নামেন্ট থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে?

ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি মিস করা এবং একটি দুর্দান্ত হেডার পোস্টে লেগে ফিরে আসার আফসোসে পুড়ছেন তারেমি। এরপর ম্যাচের শেষ মুহূর্তে খলিলজাদেহের গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল না হলে নিজেদের ইতিহাসে সপ্তম প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো সরাসরি নকআউটের টিকিট পেয়ে যেত পার্সিয়ানরা। তবে মাঠের সেই হতাশার চেয়েও তারেমিকে বেশি পুড়িয়েছে আমেরিকার বৈষম্যমূলক আচরণ।
ফুটবল ম্যাচটি ছাপিয়ে সিয়াটলের গ্যালারি ও আশপাশের পরিবেশ কাল রূপ নিয়েছিল এক রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে। আমেরিকার মাটিতে ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যার ফলে গত সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তি দুই দেশই লঙ্ঘন করার পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। ম্যাচের আগে গ্যালারির এক অংশ থেকে ইরানের জাতীয় সংগীতে অনবরত দুয়ো দেওয়া হয় এবং প্রাক-বিপ্লব আমলের ইরানি পতাকা ওড়ানো হয়।

এর ওপর যোগ হয়েছে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধ। মেক্সিকোর টিজুয়ানায় বেসক্যাম্প করা ইরান দলকে প্রতি ম্যাচের জন্য আমেরিকার সিয়াটলে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। অনেক দেনদরবারের পর ইউএস প্রশাসন ম্যাচের একদিনের বদলে মাত্র দুই দিন আগে ইরানকে সিয়াটলে আসার অনুমতি দিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিকে টোটাল লজিস্টিক ‘ডিজাস্টার’ বা বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে তারেমি বলেন, পেশাদার ফুটবলার হিসেবে এত বড় একটি পেশাদার টুর্নামেন্টে প্রতি ম্যাচের জন্য এভাবে সীমান্ত পার হয়ে যাতায়াত করা কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা মেক্সিকোর মানুষকে ভালোবাসি, টিজুয়ানার মানুষ খুবই বিনয়ী ও চমৎকার। কিন্তু আমাদের সাথে যা হচ্ছে তা অন্যায়।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জান্নি ইনফান্তিনোর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে ইরান অধিনায়ক প্রকাশ করেন, প্রথম ম্যাচের পর ইনফান্তিনো তাদের ড্রেসিংরুমে এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা তো মাত্র শুরু’। তারেমির তোপ, গ্রুপ পর্ব রোববার শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ এখন পর্যন্ত আমাদের লজিস্টিক সাপোর্টের মানুষদের আমাদের সাথে থাকার অনুমতি দেয়া হয়নি! ফিফার তো সব সমস্যার সমাধান করার কথা, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা শুরু থেকেই এই বৈষম্য থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
কান্না ও ক্ষোভের মিশেলে বিশ্ব ফুটবল নিয়ামক সংস্থার দিকে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তারেমি বলেন, আমাদের সাহায্য করার মতো আজ কেউ আছে? কেউ কি আমাদের পাশে দাঁড়াবে? তারা যদি আসলেই চায় যে ইরান এই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় হয়ে যাক, ঠিক আছে, তবে আমাদের বের করে দিন! আমরা চলে যাচ্ছি। কিন্তু দয়া করে ফুটবলের নামে এই অবিচার করবেন না।
ইতিমধ্যেই গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পাওয়া ইরান রোববার বাকি ম্যাচগুলোর জটিল সমীকরণের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাগ্যের জেরে যদি তারা শেষ ৩২ বা রাউন্ড অব ৩২-এ পৌঁছেও যায়, তবে আমেরিকার মাটিতে রাজনৈতিক ও মানসিক এই ক্ষত পার্সিয়ানদের কতটা তাড়িয়ে বেড়াবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন!
