বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে কেপ ভার্দে। তবে এই হারের পরও দলের ফুটবলারদের নিয়ে অসীম গর্ব প্রকাশ করেছেন কেপ ভার্দের মাস্টারমাইন্ড কোচ বুবিস্তা।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৭তম স্থানে থাকা এই আফ্রিকান দেশটিই ছিল এবারের বৈশ্বিক আসরের সবচেয়ে বড় ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’। গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং উরুগুয়েকে রুখে দেওয়ার পর, নকআউটে ট্রফি হোল্ডার আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যেভাবে তারা ম্যাচটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

সাবেক সেন্ট্রাল ব্যাক বুবিস্তাই ছিলেন কেপ ভার্দের এই রূপকথার প্রধান কারিগর। তাঁর দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই বিশ্বের কোনো এলিট বা নামী লিগে খেলেন না। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে বিশ্বসেরাদের বিরুদ্ধে তাদের এই বুক চিতিয়ে লড়াই দেখিয়েছে তারা কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে।
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের আবেগঘন পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বুবিস্তা বলেন, ড্রেসিংরুমের অনুভূতিটি এখন চরম বিষাদের। আমরা সবাই খুব বিষণ্ণ, কারণ আমরা এত কাছে, এত অবিশ্বাস্য রকম কাছে গিয়েও টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিচ্ছি। তবে প্রচণ্ড মন খারাপের মাঝেও খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। এই কান্না, এই আবেগই আমাদের পরিপক্ব হতে এবং সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। এটি প্রমাণ করে, এই দলটির একটি ‘আত্মা’ আছে।
আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে পুরো ১২০ মিনিট সমানে সমানে লড়াই করাকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা মনে করছেন বুবিস্তা। তিনি যোগ করেন, আমি আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে এবং মাঠে তারা যা করেছে, তা নিয়ে গর্বিত। তারা সম্পূর্ণ মর্যাদা এবং সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছে। আর্জেন্টিনা কেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, তা তারা আজ মাঠে প্রমাণ করেছে। তবে আমি এটাও বলতে পারি, আমাদের দলও দেখিয়েছে এই ম্যাচটি খেলার জন্য তারা কতটা ক্ষুধার্ত ছিল। আমার মনে হয় না এই বিশ্বকাপে অন্য কোনো দল আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে এভাবে দুই গোল দিয়ে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যেতে পারত। এটিই আমাদের দলের চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং দক্ষতার প্রমাণ।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই বুবিস্তা একটি কথা বারবার বলে এসেছেন, কেপ ভার্দের এই প্রথম বিশ্বকাপ মিশন শুধু ফুটবল খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল তাদের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রের চেতনাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার এক মাধ্যম। ম্যাচ শেষে সেই সুরেই তিনি বলেন, ফুটবল খেলার চেয়েও বড় বিষয় ছিল বিশ্বের কাছে আমাদের নিজস্ব জাতিসত্তা ও পরিচয়কে মেলে ধরা। আমরা পুরো টুর্নামেন্টে যতদিন টিকে ছিলাম, বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে ফেয়ার-প্লে বা ন্যায্য ফুটবল উপহার দিতে চেয়েছি এবং আমরা প্রতিপক্ষের সাথে সমান স্তরে থেকেই লড়াই করেছি।
তিনি আরও যোগ করেন, এই ছোট দেশটিকে যেভাবে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করা হয়েছে, সেজন্য সবারই এই খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানানো উচিত। সব কিছুর ঊর্ধ্বে, আমরা যা অর্জন করেছি তা নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। এই বিশ্বকাপ আমাদের পরিশ্রমের সুবিচার করেছে। হেরে যাওয়াটা সবসময়ই কষ্টের, কিন্তু আমাদের এই যাত্রা ছিল সত্যিই অবিশ্বাস্য। ফুটবলপ্রেমীরা ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জয় হিসেবে মনে রাখলেও, কেপ ভার্দের এই অসম সাহসী লড়াই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক বীরোচিত রূপকথা হিসেবেই লেখা থাকবে।
তথ্যসুত্র: রয়টার্স
