পতেঙ্গায় দুর্ঘটনায় পড়া ‘দ্য ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০’ -এর দুর্ঘটনার ইতিহাস বেশ পুরোনো। যদিও বিমানটিকে বলা হয় সর্বাধুনিক। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হবার পর এ পর্যন্ত তিনবার দুর্ঘটনার মুখে পড়লো প্রশিক্ষণ যুদ্ধ বিমানটি। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই মডেলের বিমান একাধিকবার দুর্ঘটনায় পড়েছে।
রাশিয়ায় তৈরি এই কমব্যাট প্রশিক্ষণ বিমানটির মূল নাম ‘দ্য ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০’ হলেও একে সংক্ষেপে ওয়াইএকে বা ইয়াক-১৩০ নামে ডাকা হয়। ন্যাটো ডাকে মিটেন নামে।
দুই আসনের এই বিমান উচ্চতর প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলেও যুদ্ধে এটি হালকা মাত্রায় ব্যবহার উপযোগী। বিশেষ করে স্বল্প মাত্রার আক্রমণে ব্যবহারের জন্যও এটাকে কাজে লাগানো যায়।

চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মতো কাজ করতে পারে ওয়াইএকে। পঞ্চম প্রজন্মের সুখোই-৫৭ বিমানের কাজও চালিয়ে নেয়ার সক্ষমতা রয়েছে এটির।
ইয়াক-১৩০ বিমানটির মানোন্নয়ন করে রাশিয়া ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে -এর প্রথম ফ্লাইট পরিচালনা করেছিলো। পরে ২০১০ সালে রুশ বিমান বাহিনীতে সংযুক্ত হয় দুই ইঞ্জিনের বিমানটি।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম স্পুটনিকের তথ্য অনুযায়ী, হালকা ওজনের বিমানটি রাশিয়ার এডভান্সড মডেলের একটি ফাইটার। যা সর্বোচ্চ ৩০০০ কেজি অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করতে পারে। এছাড়াও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, স্থল হামলার ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা, রকেট পডসহ বেশকিছু অস্ত্র বহন করতে পারে এ বিমান।

একইসাথে ইয়াক-১৩০ স্থলভাগের হামলায় কিংবা আকাশ থেকে আকাশে উৎপক্ষেপনযোগ্য অস্ত্র বহনে ব্যবহার করা যায়।
বিমানের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে বিমানবাহিনীকে সবধরনের সহযোগিতা দেয়া যায়। একই সাথে স্বল্প পরিসরে বিমান হামলায়ও ব্যবহার করা যায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বাসসযোগ্য প্রশিক্ষণ বিমানের একটি ‘ইয়াক-১৩০’। আধুনিক এই কমব্যাট প্রশিক্ষণ বিমানটি বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার স্বীকার হয়েছে।
২০০৬ সালের ২৬ জুন রাশিয়ার রায়াজান এলাকায় বিধ্বস্ত হয় একটি ইয়াক-১৩০। দু’জন পাইলটই বিনা ক্ষয়-ক্ষতিতে রক্ষা পেয়েছিলেন সেই দুর্ঘটনায়। এরপর ২০১০ সালের ২৯ মে রাশিয়ার লিপেৎস্ক বিমান ঘাঁটিতে পরীক্ষার সময় বিধ্বস্ত হয় আরেকটি ইয়াক-১৩০। সেখানেও দুই পাইলট কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই রক্ষা পান।

২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয় একটি ‘দ্য ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০’। মারা যান এক পাইলট।
২০২১ সালের ১৯ মে বেলারুশ বিমানবাহিনীর ইয়াক-১৩০’র বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মৃত্যু হয় দুই পাইলটের। তাছাড়া শহরের একটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার বিমানবাহিনীর দুটি ইয়াক-১৩০ ধ্বংসের দাবি করে জান্তা বিরোধী পিপলস ডিফেন্স ফোর্স -পিডিএফ।
২০২২ সালের ২৯ জুন পাখির সাথে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত হয় মিয়ানমার বিমানবাহিনীর আরও একটি ইয়াক-১৩০।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বাইরে বাংলাদেশই দ্বিতীয় দেশ, যারা রাশিয়ার কাছ থেকে ইয়াক-১৩০ বিমান পেয়েছে। পাইটলদের আধুনিক প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ -এর আওতায় বাংলাদেশ ২০১৪ সালে জানুয়ারি মাসে রাশিয়ার সাথে এই বিমান কেনার চুক্তি করে। প্রথমে ২৪টি ইয়াক-১৩০ বিমান কিনার কথা থাকলেও, আর্থিক সমস্যার কারণে পরে তা কমিয়ে ১৬টি কেনার সিদ্ধান্ত হয়।

স্পুটনিকের খবরে বলা হয়, ২০১৪ সালে রাশিয়ান ঋণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ২৪টি ইয়াক ১৩০ বিমানের অর্ডার দেয় রাশিয়াকে, যার আনুমানিক মূল্য তখনকার সময়ে প্রায় আটশ’ মিলিয়ন ডলার ছিলো। সর্বাধুনিক কমব্যাট ট্রেইনার এয়ারক্রাফট ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০’র প্রথম চালানটি ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছায়। পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী সবকটি ইয়াক-১৩০ বিমান বাংলাদেশকে সরবরাহ করে রাশিয়া।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে ‘ইয়াক-১৩০’ সিরিজের এই বিমান যুক্ত হবার পরে একাধিকবার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে।
২০১৭ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় বিধ্বস্ত হয় একটি ইয়াক-১৩০। দু’জন পাইলটই অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসেন সে সময়। একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুই বিমানের সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয় দুটি ইয়াক-১৩০। জীবিত উদ্ধার করা হয় দুই বিমানের চার পাইলটকে।

সবশেষ ৯ মে চট্টগ্রামে বিধ্বস্ত হয় একটি ইয়াক-১৩০। প্যারাসুটের মাধ্যমে বেরিয়ে আসেন দুই পাইলট। তবে তাদের একজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
বর্তমানে রাশিয়াসহ বিশ্বের মোট আটটি দেশ ব্যবহার করছে ইয়াক-১৩০। আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, লাওস ও বেলারুশের বিমান বাহিনীতে আছে এই প্রশিক্ষণ বিমান। সবশেষ এই বিমান যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ইরানের বিমান বাহিনীতে।
পাইলট রিফাতের দাফন সম্পন্ন