দলের অভ্যন্তরে তীব্র ফাটল আর রাজনৈতিক ডামাডোলের আবহেই মঙ্গলবার কলকাতার রাজপথে নেমে সরাসরি বিজেপিকে উৎখাতের ডাক দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওয়াই চ্যানেলের ধর্নামঞ্চ থেকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হাটাকে যায়েঙ্গে (যদি বেঁচে থাকি বিজেপিকে সরাবই)। আমাকে কোনোভাবেই আটকে রাখা যাবে না।
দুপুর ২টা নাগাদ কালীঘাটের বাড়ি থেকে বের হন মমতা। প্রথমে তিনি রেড রোডে গিয়ে বিআর অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দেন। সেখান থেকে সোজা পৌঁছান ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেনের মতো বিশ্বস্ত নেতারা।

রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে পূর্বনির্ধারিত ধর্নার অনুমতি না মেলায় পুলিশের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন মমতা। হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখানে মাইক ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক দিয়ে বলতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আমাকে আটকানো যাবে না। যেখানে পারব, সেখানেই বসে পড়ব। সংবিধান রক্ষা এবং এই অত্যাচারের মোকাবিলার জন্য আমার লড়াই চলবে, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে (করব নয়তো মরব)।
ধর্নামঞ্চ থেকে দলীয় বিধায়ক ও কাউন্সিলরদের ভয় দেখানোর পাশাপাশি দিল্লি থেকে বিজেপি সরকার কলকাঠি নেড়ে তৃণমূলকে ফেলে দেয়ার চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ তোলেন মমতা। গত শনিবার সোনারপুরে মৃত তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আক্রান্ত হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতা অভিযোগ করেন, অভিষেক হেলমেট না পরলে পাথরটা সরাসরি ওর মাথায় লাগত। এরপরই হাসপাতালের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিষেককে যখন সিরিয়াস অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, তখন সিইও’র অনুমতি নেওয়ার দোহাই দেওয়া হচ্ছিল। পুলিশ নার্সিং হোমকে হুমকি দিচ্ছে। পরে ট্রমা কেয়ারে ভর্তি করার পর হাসপাতালের সিইও এবং শোভন চট্টোপাধ্যায় আমার সামনে এসে ক্ষমা চেয়ে বলেন, তারা আর চাপ নিতে পারছেন না, তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে।

রাজ্যে বর্তমানে ‘বুলডোজার’ রাজনীতি চলছে দাবি করে মমতা বলেন, পুলিশ গিয়ে তৃণমূল বিধায়কদের বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছে না এবং দল ছেড়ে ‘নতুন তৃণমূল’ তৈরি করার জন্য চাপ দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তাঁর ঝাঁঝালো প্রশ্ন, কারা নতুন তৃণমূল তৈরি করবে? যারা প্রথম থেকে দলের সঙ্গে আছেন তারা নাকি যারা দলের প্রতীকী জিতেছে তাঁরা?
তবে ধর্নায় বাধা দেওয়া নিয়ে উপস্থিত পুলিশের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, যারা আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার, নবান্ন এবং সব থানা ঘেরাও হবে। যদিও পরক্ষণেই কিছুটা সুর নরম করে তিনি বলেন, আমি পুলিশকে দোষ দিচ্ছি না। ওরা চেয়ারের কথা শোনে, চেয়ার যা বলে তা-ই করে।
উল্লেখ্য, গত রবিবার কালীঘাটের বৈঠকে তৃণমূলের পরিষদীয় দলে বড়সড় ফাটল প্রকাশ্যে আসে, যেখানে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই অনুপস্থিত ছিলেন। সই জাল-কাণ্ডের বিড়ম্বনার মধ্যেই আ রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্নার অনুমতি না মেলায় পুলিশের সাথে তৃণমূলের ব্যাপক সংঘাত তৈরি হয়। সোমবার মধ্যরাতে ইমেল পাঠিয়ে পুলিশ জানায়, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে নয়, ওয়াই চ্যানেলে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ধর্না করা যাবে। এই নিয়ে কুণাল ঘোষ ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন যে, বিরোধী স্বরকে দমিয়ে রাখতেই এই ধরণের টালবাহানা করা হচ্ছে।

তৃণমূলের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে, অতীতে যখন রাজ্যে তৃণমূলের শাসনকাল ছিল, তখনও বিজেপির প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে এভাবেই পুলিশের অনুমতি মিলত না। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুকে প্রতিবারই আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সভার অনুমতি নিতে হতো।
তবে সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বেলা বাড়তেই ফিরহাদ হাকিম, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যদের মতো প্রবীণ নেতারা কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ওয়াই চ্যানেলে জড়ো হন। চারপাশের তীব্র ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাঝেই বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের শপথ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-ইন্ডিয়া টুডে
