কখনও 'বাঘা' কখনও আবার 'বিরিঞ্চি বাবা', কখনো বা 'বার্বুচি ধনঞ্জয়', নিজেকে বারে বারে ভেঙে গড়েছেন তিনি। বলছি রবি ঘোষের কথা। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণ যুগের ইতিহাস বলতে ঠিক যা বোঝায়, তেমনই এক অধ্যায়ের সরিক ছিল রবি ঘোষ।
আজ এই অভিনেতার প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে চলে যান রবি ঘোষ।
রবি ঘোষের অনবদ্য অভিনয় ভঙ্গিতে আজও মন্ত্রমুগ্ধ আট থেকে আশি। ১৯৫৯ সালে 'আহবান' এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন রবি ঘোষ। তারপর নজর কাড়েন 'গল্প হলেও সত্যি' সিনেমায় বাবুর্চি ধনঞ্জয়ের চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
তারপর একের পর এক সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে তাকে নিয়মিত অভিনয় করতে দেখা গেছে। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' চলচ্চিত্রে 'বাঘা' চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
রবি ঘোষের জন্মটাই যেন অভিনয়ের জন্য। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই নাটকে অভিনয়ের হাতেখড়ি। তারপর যখন কলেজে ভর্তি হলেন তখন বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুললেন ‘বন্ধুমন’ নামে একটি নাটকের দল। মহড়া দিতেন আশুতোষ কলেজের ছাদে।
কিন্তু, বাবা জীতেন্দ্রনাথ তা একেবারেই পছন্দ করতেন না। প্রায়ই স্ত্রী জ্যোৎস্না রানীকে বলতেন, ‘অভিনয় কইরা সময় নষ্ট করে ক্যান? তোমার পোলারে কয়া দিও ওই চেহারায় অভিনয় হয় না। সে ছিলো দুর্গাদাস বাঁড়ুজ্যে, হিরোর মতন চেহারা’।
অভিনয়ের এমনই পোকা ছিলেন যে বাড়ি থেকে তাকে বের পর্যন্ত করে দেওয়া হয়েছিলো। তবে মার সমর্থন ছিলো পুরোপুরি। তাই তিনি সামনে এগুতে পেরেছিলেন। ভাগ্যিস মার সমর্থন ছিলো নইলে বাংলা চলচ্চিত্র এতো শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা পেতো না।
যিনি অভিনেতা নয়, কমেডিয়ান নয় বরং চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে সব সময় পরিচয় দিতেন। বলতেন যেকোনো চরিত্রই ফুটিয়ে তোলা একজন চরিত্রাভিনেতার কাজ।
লোকে বলতো, ‘রবি ঘোষ মানেই একাই একশো’। পরিচালক তপন সিংহ তাই বলেছিলেন, ‘গোটা ভারতবর্ষে রবির মতো অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন চরিত্রাভিনেতা বাস্তবিক খুঁজে পাওয়া কঠিন। রবি ঘোষকে আমি সেই অর্থে কখনও কমেডিয়ান হিসেবে দেখিনি’।
ব্যক্তি রবি ঘোষ ছিলেন ভিন্ন ধাঁচের। গুরুগম্ভীর মানুষ। সময় পেলেই ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়ে সময় কাটাতেন। আর পড়তেন প্রবন্ধ-নাটকের নানা বই।
প্রথম জীবনে কমিউনিজমে দীক্ষিত হয়েও পরবর্তীতে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ পড়তেন। সে অর্থে নিজে পূজার্চনা না করলেও, অন্যের বিশ্বাস-ভক্তিকে কখনও ছোট করেননি।
সত্যজিৎ রায় পছন্দ করতেন রবি ঘোষের অভিনয়। তিনি বলতেন, ‘রবির চোখ দুটোই কথা বলে’।
একাত্তর/ এনএ
