তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে টালমাটাল শ্রীলংকার রাজনীতি একের পর এক পালাবদল চলছে। দেশ জুড়ে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজপাকসের ক্ষমতাসীন জোট। এতে গভীর সংকটে পড়লো রাজপাকসের পরিবার।
মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) শ্রীলংকার পার্লামেন্টে শাসক জোটের ৪১ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করে বেরিয়ে যান। এতেই ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান মহিন্দা রাজাপাকসে। এখন ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে বিরোধীদের সমর্থন চাইতে হবে।
এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট, যিনি ঘটনাচক্রে মহিন্দার ভাই গাটবোয়া রাজপাকসে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে উল্টো রাজাপাকসে সরকারের পদত্যাগ চেয়েছে।
শ্রীলঙ্কা পার্লামেন্টে পদুজানা পেরামুনার ১১৭ জন সদস্য ছিলেন। জোটসঙ্গী শ্রীলঙ্কার ফ্রিডম পার্টির হাতে ছিলেন ১৫ জন সংসদ সদস্য। ১০ দলের জোটের হাতে ছিল ১৪ জন সদস্য।
বিরোধী সামাগি জানা বালাওয়েগার হাতে ৫৪ জন সদস্য, তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের হাতে ১০ এবং বাকিদের হাতে ১৫ জন সদস্য ছিলেন।
আপাতত শ্রীলঙ্কা পদুজানা পেরামুনার হাতে মাত্র ১০৫ জন সংসদ সদস্য আছেন। শাসক দলসহ ‘বিদ্রোহী’ সংসদ সদস্যের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ৪১-তে।

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর, এখন শাসক জোটের ক্ষমতায় ঠিক থাকা কঠিন হয়ে গেলো বলেই মনে করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে লঙ্কার রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিনও হুমকির মধ্যে চলে গেলো।
শ্রীলংকার পার্লামেন্টে যখন বড় ধরনের ধাক্কা খেলো রাজাপাকসের জোট, তখন অন্যদিকে দেশটির রাজপথজুড়ে আরও তীব্র হয়েছে বিক্ষোভ। প্রথমে দেশটির তরুণরা এই বিক্ষোভ প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিলেও, এখন তাতে সমর্থন আসছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা থেকে।
গত কয়েক দিন ধরে চরম দুর্দশায় শ্রীলঙ্কাবাসী। এক কেজি চাল ৫০০ টাকার বেশি। দেশে আর ছিটেফোঁটা ডিজেল নেই। ফলে রাস্তায় সরকারি, বেসরকারি বাস বন্ধ। ১৩ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ নেই। হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার বন্ধ। ওষুধ নেই। বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য রাস্তার আলো বন্ধ।

মোবাইল পরিসেবা ব্যাহত। বন্ধ থাকছে অফিসের কাজ। চলছে না ট্যাক্সি সার্ভিস। এই পরিস্থিতির পর রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয় দেশটির মানুষ। গেলো বৃহস্পতিবার সড়কের বিক্ষোভ রূপ নেয় সহিংসতায়। জারি করা হয় জরুরি অবস্থাতে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই।
জরুরি অবস্থার পাশাপাশি কঠিন আইন কার্যকর করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট গোটবায়া। এতে করে যে কোন ব্যক্তিকে বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটকে বা গ্রেপ্তার করা যাবে। সেই সঙ্গে কারফিউ জারি করা হয়েছে দেশজুড়ে। বিক্ষোভ ঠেকাতে ৩৬ ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয় সামাজিক মাধ্যম।
আরও পড়ুন: জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের ডাক দিলেন রাজাপাকসে
রোববার শ্রীলঙ্কার মন্ত্রীসভা থেকে ২৬ জন মন্ত্রী একযোগে পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর অজিত কাব্রাল পদ ছেড়ে চলে যান। প্রেসিডেন্ট গোটবায়া এবং প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে শুধু ক্ষমতায় আছেন।
অর্থমন্ত্রী পদে বসানো হয় আলি সাবরিকে। দেশবাসীর বিক্ষোভের মুখে পড়ে এক রাত ঘুরতেই পদত্যাগ করে চলে যান সেই সাবরিও। এই অবস্থায় হন্য হয়ে মিত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন মহিন্দা। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, পার্লামেন্ট অধিবেশন ডেকে সংখ্যা গরিষ্ঠতা প্রমাণ করা।

শ্রীলংকার ক্ষমতাবলয় এখন রাজাপাকসে পরিবারের হাতে। মহিন্দা হলেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাই গোটবোয়া প্রেসিডেন্ট। শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী ছোট ভাই বেসিল। কৃষিমন্ত্রী পরিবারের সব থেকে বড় ভাই চামাল। ক্রীড়ামন্ত্রী ভাগ্নে নামাল।
বলা বাহুল্য, এই পরিবারের বিরুদ্ধেই একপ্রকার ফুঁসছে শ্রীলংকা। পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন তারা। বিক্ষোভকারীদের একটাই দাবি রাজাপাকসে সরকারের পদত্যাগ। কারণ, তারা বলছেন রাজাপাকস পরিবারের বিদায়েই সম্ভব শ্রীলংকা মুক্তি।
একাত্তর/আরএ
