আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। এ আবেদন গৃহীত হলে শেষ হবে তাদের কয়েক দশকের নিরপেক্ষ অবস্থান ও সামরিক জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকার দিন।
বৃহস্পতিবার (১২ মে) ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানাবেন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সাউলি নিনিস্তো। আর আগামী সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের মতামত দেবেন সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। যদি তারা রাজি হন, তাহলে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করবে দুই দেশই।
ফিনল্যান্ডের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ন্যাটোতে যোগ দেয়ার পক্ষে থাকার সম্ভাবনা বেশি হলেও, সুইডেনের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তারাও শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়ার পক্ষেই মত দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবেদন করার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্য হওয়া পর্যন্ত এই দুই দেশের নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো উদ্বেগ নিরসন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও বুধবার দুই দেশে গিয়ে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন।
কিন্তু এতদিনের সামরিক নিরপেক্ষতার পর কেন এই দুই দেশ সামরিক জোটের সদস্য হতে চাইছে? আর শেষমেশ তারা যোগ দিলে তার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে? এমনই কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন বিবিসির ফেলন চ্যাটার্জি।
কেন এখন তারা ন্যাটোতে যোগ দিতে চায়?
উত্তর ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপসমূহ। এর ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন।
ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেকজান্ডার স্টাব বলেন, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার সাথে সাথেই ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগ দেয়ার বিষয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো।
এদিকে সুইডেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিটার হাল্টভিস্ট বলেন, পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তিনি 'আস্থার অযোগ্য এবং হিংস্র, রক্তাক্ত ও বর্বর যুদ্ধ করতে প্রস্তুত'।
তাই গত নভেম্বরে সুইডেন ন্যাটোতে যোগদান করবে না বলে জানালেও, এখন ফিনল্যান্ড ও সুইডেন উভয়েই জোটে যোগ দিলে নর্ডিক অঞ্চল আরও সুরক্ষিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে গত বেশ কয়েক বছরে ফিনিশদের জনসমর্থন ছিল ২০ থেকে ২৫ শতাংশের ঘরে। তবে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর তাদের সমর্থন গিয়ে পৌঁছেছে ৭৬ শতাংশে।
এদিকে ন্যাটোতে যোগদানকে সমর্থন করেন ৫৭ শতাংশ সুইডিশ, যা ফিনিশদের তুলনায় কম হলেও গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক ফিনল্যান্ড আক্রমণের স্মৃতি থেকে ফিনিশ নাগরিকরা ন্যাটোতে যোগ দেয়ার পক্ষে সমর্থন দিচ্ছেন। সেবার দখল হয়ে যাওয়া এড়ালেও, নিজেদের ১০ শতাংশ এলাকা হারাতে হয়েছিলো তাদের।
গত প্রায় এক দশক ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সুইডেনের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে সুইডেন।
যোগ দিলে কী কী পরিবর্তন আসবে?
এক দিক থেকে দেখলে সুইডেন আর ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিলে তেমন কিছুই পরিবর্তন হবে না। ১৯৯৪ সাল থেকে এই দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোর অংশীদার হয়। শীতল যুদ্ধের পর থেকে তারা বেশ কয়েকবার ন্যাটোর মিশনে অংশগ্রহণ করে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে। এটি অনুযায়ী জোটবদ্ধ যেকোনো দেশের ওপর আক্রমণকে বাকি সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে সদস্য হলে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা গ্যারান্টি পাবে।
দুই দেশই হঠাৎ করে ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে অগ্রসর হলেও, ফিনিশ ইতিহাসবিদ হেনরিক মেইনান্দের মনে করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই ন্যাটোর দিকে ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হচ্ছিল ফিনল্যান্ড।
১৯৯২ সালে ৬৪টি মার্কিন যুদ্ধবিমান কেনার তিন বছর পর সুইডেনের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয় ফিনল্যান্ড। তারপর থেকে প্রত্যেক সরকারই ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেছে।
এদিকে নব্বইয়ের দশকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে সুইডেন। সেনাবাহিনীর আকার সংকোচনের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী মিশন পাঠাতে শুরু করে তারা।
তবে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পর সেনাবাহিনীতে নিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে শুরু করে সুইডেন। ২০১৮ সালে প্রতিটি বাড়িতে সংকট ও যুদ্ধকালীন করণীয় সম্পর্কে প্যামফ্লেট পাঠানো হয়।
ইতোমধ্যে ন্যাটোর দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের শর্তে রাজি হয়েছে ফিনল্যান্ড, আর সুইডেনও তা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যোগ দিলে কী কী ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন?
ন্যাটো সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে পুতিন বরাবরই তার ইউক্রেন আক্রমণকে ন্যায্যতা দেয়ার জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। কাজেই ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দিলে রাশিয়া সেটিকে উসকানি হিসেবে দেখবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
দুই দেশকেই এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়ার কথা জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এমনটা হলে পোল্যান্ড ও লিথুয়েনিয়ার মাঝখানে অবস্থিত রাশিয়ার ছিটমহল কালিনিনগ্রাদে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করার হুমকি দিয়েছেন পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহচর দিমিত্রি মেদভেদেভ।
এসব হুমকি পুরোপুরি নাকচ না করলেও, রাশিয়ার সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও আকাশসীমা লঙ্ঘনেরই বেশি আশঙ্কা দেখছেন ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেকজান্ডার স্টাব।
ন্যাটোতে যোগদান কি সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে আরও সুরক্ষা দেবে?
সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের কিছু মানুষ মনে করেন, ন্যাটোতে যোগ দেয়া তাদেরকে কোনো বাড়তি সুরক্ষা দেবে না।
সুইডিশ পীস অ্যান্ড আরবিট্রেশন সোসাইটির ডেবোরাহ সলোমন মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে ন্যাটোর বাধাদান উত্তেজনা সৃষ্টি করে ও রাশিয়ার সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দেয়। এর ফলে সুইডেনের শান্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আবার ন্যাটোতে যোগ দিলে সুইডেন বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের নেতৃত্বের স্থান হারাবে বলে মনে করেন অনেকে, যেভাবে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশের পররাস্ট্র মন্ত্রীদের নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় অংশ না নিতে চাপ প্রয়োগ করেছিলো।
তবে সুইডেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দাবি করেন, সুইডেনের ন্যাটোর সদস্যপদ এবং নিরস্ত্রীকরণের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনো সংঘর্ষের সৃষ্টি হবে না।
নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ব্যবহার করে ষাট থেকে আশির দশকে উপনিবেশিত দেশগুলোর মিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছিল সুইডেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সরব আওয়াজ তোলা সুইডেন ছিল সত্তরের দশকে আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে সমর্থনকারী একমাত্র পশ্চিমা দেশ।
ডেবোরাহ সলোমনের মতে, ন্যাটোতে যোগ দিলে তা হবে তাদের মধ্যস্থতাকারী হওয়ার স্বপ্নের অবসান।
তবে ফিনল্যান্ডের নিরপেক্ষ অবস্থান কিছুটা আলাদা। ১৯৪৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে 'মিত্রতা চুক্তি'র ফসল ছিল এটি। নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার বাস্তবমুখী উপায় ছিল এটি।
সুইডেনের নিরপেক্ষতা ছিল আত্মপরিচয় ও আদর্শের প্রশ্ন, আর ফিনল্যান্ডের জন্য এটি ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। ফিনিশ ইতিহাসবিদ হেনরিক মেইনান্দেরের মতে, ফিনল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলকে 'বাফার জোন' হিসেবে ব্যবহার করার ফলেই সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়ার কথা ভাবতে পারছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসে ফিনল্যান্ড। সোভিয়েতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়ে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান তাদের অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
নব্বইয়ের দশকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসার পরপরই ন্যাটোতে যোগ দেয়া ফিনল্যান্ডের জন্য অনেক বড় পদক্ষেপ বলে মনে হলেও, এখন বেশিরভাগ ফিনিশই তা করতে প্রস্তুত বলে মনে করছেন তারা।
একাত্তর/এসজে
