রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জাতীয় উৎসব ‘বিজয় দিবস’ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে আগ্রাসী ভাষণ দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মস্কোর ঐতিহাসিক রেড স্কয়ারে দাঁড়িয়ে তিনি একদিকে যেমন ইউক্রেন যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন, অন্যদিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এবং যুদ্ধের বাস্তবতায় এবারের আয়োজন ছিল অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় বেশ সীমিত।

শত শত সামরিক কর্মকর্তার সামনে দেয়া ভাষণে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধকে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত’ যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন এখন একটি ‘আগ্রাসী শক্তিতে’ পরিণত হয়েছে, যাদের সরাসরি অস্ত্র ও মদত দিচ্ছে পুরো ন্যাটো জোট। পুতিন বলেন, বিজয়ী প্রজন্মের মহান কীর্তি আজ বিশেষ সামরিক অভিযানে নিয়োজিত সেনাদের লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রাণিত করছে। তারা ন্যাটোর সমর্থনে পুষ্ট এক আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলা করছে, কিন্তু তবুও আমাদের বীরেরা এগিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধ প্রচেষ্টায় রাশিয়ার সাধারণ নাগরিক বিশেষ করে বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে পুতিন বলেন, যুদ্ধের কৌশল যা-ই হোক না কেন, দেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয়।
দীর্ঘদিন পর এই প্রথম মস্কোর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে কোনো সাঁজোয়া যান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যায়নি। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল নজিরবিহীন। গত সপ্তাহে রুশ কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্যারেড সংক্ষিপ্ত হয়েছে। রুশ এমপি ইয়েভজেনি পপভ এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের ট্যাঙ্কগুলো এখন রেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ করার চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজন।

তবে ভারী সমরাস্ত্র না থাকলেও রেড স্কয়ারে হাজার হাজার সৈন্যের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। কুচকাওয়াজ শেষে কামানের গর্জন ও সামরিক ব্যান্ডের সুরের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় শুক্রবার ঘোষিত তিন দিনের অস্ত্রবিরতির মাঝেই এই প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। প্যারেড চলাকালীন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অনুষ্ঠান শেষে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, ইউক্রেন অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি এবং ইউক্রেনও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত বছরের ৮০তম বার্ষিকীর তুলনায় এবারের প্যারেডে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। গত বছর শি জিনপিং ও লুলা দা সিলভাসহ ২৭ জন রাষ্ট্রপ্রধান থাকলেও এবার বিদেশিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বেলারুশ নেতা আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শভকত মিরজিওয়েভ। তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্লোভাক প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো পুতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুচকাওয়াজে অংশ নেন।

বিজয় দিবসের গুরুত্ব ও ঐতিহ্য
রাশিয়ায় ৯ মে অত্যন্ত আবেগের দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (যা রাষ্ট্রে 'গ্রেট প্যাট্রিয়াটিক ওয়ার' নামে পরিচিত) নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়কে এই দিনে স্মরণ করা হয়। সেই যুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। পুতিন শাসনের শুরু থেকেই এই দিনটিকে রাশিয়ার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বা প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
মস্কোর পাশাপাশি ভ্লাদিভোস্তক, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ক্রাসনোয়ারস্কেও ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান হয়েছে। তবে নিরাপত্তা জনিত কারণে অনেক শহরে কুচকাওয়াজ ৱবাতিল করা হয়। রেড স্কয়ারে প্যারেড শেষে পুতিন অজ্ঞাতনামা সেনাদের পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং ক্রেমলিনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
