মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আকস্মিক ঘোষণায় ইউরোপের প্রতিরক্ষা নীতিতে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। পোল্যান্ডে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েনের এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেই জানিয়েছেন ট্রাম্প। পোল্যান্ডের সদ্য নির্বাচিত কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোতস্কির সাথে নিজের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের খাতিরেই তিনি এই বিশেষ উপহার দিচ্ছেন বলে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, মাত্র কয়েক দিন আগেই পোল্যান্ডে সেনা মোতায়েনের একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রস্তাব বাতিল করেছিল পেন্টাগন। সেই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহের মাথায় ট্রাম্পের এই আকস্মিক ডিগবাজি বা ইউ-টার্ন ন্যাটো মিত্রদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি আচরণ নিয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে বিভ্রান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশলে ঠিক কোন বিষয়টিকে তারা এখন অগ্রাধিকার দেবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় নেতারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, পোল্যান্ডের নতুন প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোতস্কির সফল নির্বাচন, যাকে তিনি নিজে সমর্থন করেছিলেন, এবং তাদের মধ্যকার চমৎকার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই পোল্যান্ডে এই অতিরিক্ত পাঁচ হাজার সেনা পাঠানো হচ্ছে। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট নাভরোতস্কি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডেক সিকোরস্কি এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। সিকোরস্কি জানান, এর ফলে পোল্যান্ডে মার্কিন সেনার উপস্থিতি কম-বেশি আগের স্তরেই বজায় থাকবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশ কিছুদিন ধরেই ট্রাম্প ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, কারণ তারা প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ খরচ করছে না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন ব্লককে সমর্থন না করায় এবং এই সংঘাতের সমালোচনা করায় ট্রাম্পের অসন্তোষ চরমে পৌঁছায়। এর আগে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সাথে এক বাদানুবাদের জেরে জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ট্রাম্প, এবং এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলো যখন মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউস থেকে আসা এমন সিদ্ধান্ত তাদের পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলছে। সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনেরগার্ড ন্যাটোর এক বৈঠকের আগে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই বিভ্রান্তিকর এবং এটি সামলানো মোটেও সহজ নয়। এমনকি খোদ পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারাও এই ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না।
বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় এবং ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা থেকে প্রায় হাত গুটিয়ে নেয়ায় পোল্যান্ডসহ পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগ বহাল রয়েছে। একদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে তারা ইউরোপে তাদের কমব্যাট ব্রিগেডের সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে তিন-এ নামিয়ে আনছে, অন্যদিকে ট্রাম্প পোল্যান্ডে সেনা বাড়াচ্ছেন। এই নতুন পাঁচ হাজার সেনা আগের বাতিল হওয়া চার হাজার সেনার অংশ নাকি জার্মানি থেকে সরিয়ে আনা সেনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে, ন্যাটোর সচিব মার্ক রুটে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছেন যে, ইউরোপের উচিত আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া। ন্যাটোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অভিযানে ন্যাটোর কিছু মিত্রদের আচরণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত হতাশ এবং এই বিষয়টি নিয়ে টেবিলে কঠিন আলোচনা হবে। ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ন্যাটোর আরেক সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে ট্রাম্পের সংযুক্ত করার হুমকির কারণে আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইতিমধ্যেই বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ইউরোপীয় মহলে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
হরমুজ ঘিরে নতুন পদক্ষেপ ইরানের, উত্তেজনা বাড়ছে আমিরাতের সঙ্গে
ইরানের ইউরেনিয়াম কেড়ে নেয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের
ইরানকে একযোগে ঘায়েল করার গোপন মিশন ব্যর্থ!