গাজীপুরের শ্রীপুরের সাংবাদিক বেলায়েত হোসেন জীবনের ৫৫ বছর পার করে এসে অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র হিসাবে ভর্তির আবেদন করেছেন।
আর এর জন্যে তিনি ২০১৯ সালে মাধ্যমিক এবং ২০২১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। তিনি জানান, ভর্তি পরীক্ষার জন্যে পড়াশোনা করছেন দিনে ১৪ ঘণ্টা।
পরিবার ও বন্ধুজনসহ এলাকার লোকজন তার সাফল্য কামনা করেছেন। তাদের কামনা, যেন বেলায়েতের স্বপ্ন পূরণ হয়। এজন্য সবার সহযোগিতা ও দোয়া চেয়েছেন তারা।
গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়া পশ্চিমখণ্ড এলাকার ৫৫ বছর বয়সের বেলায়েত হোসেন। বয়সের বাঁধা পেরিয়ে আর মানুষের কথা এড়িয়ে তিনি ভর্তি হতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এজন্য বেলায়েত লেখাপড়া করছেন প্রায় ১৪ ঘণ্টা, ভর্তি হয়েছেন কোচিং সেন্টারে।
বেলায়েত জানান, ১৯৮৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের হাল ধরতে হয়। এ কারণে উচ্চশিক্ষা নেয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হয় তাকে। পরে নিজের অসমাপ্ত সেই স্বপ্ন ভাই ও সন্তানদের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু কেউই তাতে সফল হননি। ৫০ বছরে পা দিয়ে তাই অনেকটা জেদ করেই ভর্তি হন নবম শ্রেণিতে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ৫৫ বছর বয়সে এবার তিনি অংশ নিতে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ঘ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়
বেলায়েত তিন সন্তানের জনক। বিবাহিত বড় ছেলে ব্যবসা করছেন, একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে ২০১৭ সালে আর ছোট ছেলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন।
বেলায়েত পেশায় একজন সাংবাদিক। তিনি দৈনিক করতোয়া পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। সাংবাদিকতা করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসার চালান বেলায়েত শেখ। বড় ছেলে স্যানিটারি পণ্যের ব্যবসা শুরু করেছেন। মাস খানেক ধরে তিনিই সংসার চালাচ্ছেন।
বেলায়েত বলেন, ভর্তি পরীক্ষার জন্য শুরুর দিকে প্রস্তুতি নিইনি। তবে এইচএসসি পরীক্ষার ফল ভালো হওয়ায় বাড়তি ভালো লাগা কাজ করলো। ভাবলাম, আমি চাইলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবো। আমার স্ত্রী-ছেলেমেয়েরাও আমাকে পড়ালেখার সুযোগ দিচ্ছে।
তিনি আরো যোগ করেন, এরপর শ্রীপুরের মাওনায় ঢাকা থেকে পরিচালিত এক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছি। আমার তো বাবা নেই, মারও বয়স হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পেলে অভিভাবক হিসেবে কাউকে যেতে হবে। এজন্য বড় ছেলেকে অভিভাবক দিয়েছি।
সাংবাদিক বেলায়েত জানান, তার উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণে পরিবারের সব সদস্য তাকে সমানভাবে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। তার লড়াইয়ে মায়ের দোয়া আছে, আছে বন্ধুদের সমর্থন। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় কিছু বিরূপ অভিজ্ঞতাও হয়েছে বলে জানান তিনি।
বেলায়েত বলেন, শুরুর দিকে এটি আমার জন্য কিছুটা কঠিনই ছিল। তখন কাছের মানুষেরাও আমাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেন। যদিও একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটি ঠিক হয়ে যায়। যাদের সঙ্গে ক্লাস করেছি, তাদের কাছ থেকে কোনো বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হইনি।
আরও পড়ুন: ভরা মৌসুমেও দিনাজপুরে চালের বাজারে অস্থিরতা
তিনি বলেন, ক্লাসের মেয়েরা আমাকে আঙ্কেল বলে ডাকতো, অন্যদিকে আমি তাদের আম্মু বলে ডাকতাম। নিজেকে আমার বয়স্ক বলে মনে হয় না, তরুণদের মতোই মনে হয়। সংসার চালিয়ে এবং কাজ করেও যে লেখাপড়া করা যায়, আমি সেটি বর্তমান প্রজন্মকে দেখাতে চাই।
৫৫ বছর বয়সে আগামী ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবেন বেলায়েত। আর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সুযোগ পেতে সবার দোয়া চেয়েছেন বেলায়েত শেখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পাসের নির্দিষ্ট সালের শর্ত থাকলেও বয়সের কোনো শর্ত নেই।
একাত্তর/আরএ
