পুরানো রোগ হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে তেমন কার্যকরী ভ্যাকসিন নেই। প্রচলিত দুটি টিকার একটি বিশ্বের ২০টি দেশে এবং অন্যটি ছয়টি দেশে অনুমোদিত। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এসব টিকা কতোটা কার্যকর হবে তা নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গুরোধে ভ্যাকসিন কতোটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রয়োজন গবেষণা। কারণ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ। এনিয়ে গণসচেতনাও নেই। ফলে এদেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব হতেই থাকবে।
বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ বছরে পৃথিবীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আটগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে পৃথিবীর ১২৯টির মতো দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে।
করোনার প্রকোপে যখন টালমাটাল বিশ্ব, তখন ভ্যাকসিনের জন্য মরিয়া ছিলো পশ্চিমা দেশগুলো। ফলাফল স্বরূপ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মিলেছে সাফল্য। কিন্তু ডেঙ্গুর মূল ভুক্তভোগী যেহেতু তৃতীয় বিশ্ব, তাই এর গবেষণা যেমন কম তেমনি ভ্যাকসিন নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহও কম। শত বছর পুরানো ডেঙ্গু রোগের জন্য এখন পর্যন্ত বিশ্বে ভ্যাকসিন আছে মাত্র দুটি।
২০১৫ সালে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সফল ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দেয় যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সানোফি ও লুই পাস্তুর ইনকরপোরেশন, সংক্ষেপে বলা হয় সানোফি-পাস্তুর। ভ্যাকসিনের নাম রাখা হয় ‘ডেঙ্গভ্যাকসিয়া’। এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় ২০টি দেশে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। তবে, এই ভ্যাকসিন শুধু ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার পর ব্যবহার করা যায়। তাও ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিন কাজ করে না।
২০২২ সালের শেষে জাপানের টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালস ‘টাক-০০৩ নামের একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর বাণিজ্যিক নাম ‘কিউডেঙ্গা’। থাইল্যান্ডের মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ডেঙ্গুর টাইপ টু’কে অক্ষশক্তি ধরে এমন এক ভ্যাকসিনের ধারণা তৈরি করে, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের সবগুলো উপধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে টাকেদা ফার্মা কিউডেঙ্গা তৈরি করে।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে এই ভ্যাকসিন কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। কিউডেঙ্গা ৬ বছর ও তার বেশি বয়সের সবাইকে দেওয়া যায়। দু'টি ডোজ দিতে হয়। প্রথম ডোজ দেওয়ার তিনমাস পরে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। এতে শরীরে জীবনব্যাপী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ইউরোপ ও এশিয়ার ছটি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ অনুমোদের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য মেলেনি।
এটি ইনজেকশনের সাহায্যে চামড়ার নিচে দিতে হয়। কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ প্রতিরোধ করে ৮০.২০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি কমায় ৯০.৪০ শতাংশ। কিউডেঙ্গার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অতিসাধারণ ও খুব কম। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইউকে, আইসল্যান্ড, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ অনেকগুলো দেশ কিউডেঙ্গা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ডেঙ্গু সংক্রমণে জর্জরিত দেশ ইন্দোনেশিয়া ৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য কিউডেঙ্গার গণটিকা দেয়া শুরু করেছে।
তাই বাংলাদেশের মানুষের ওপর এসব টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এরিমধ্যে, ভারতের প্যানেসিয়া ফার্মাসিউটিক্যালস ও সেরাম ইন্সটিটিউট যৌথভাবে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন তৈরির শেষপ্রান্তে চলে এসেছে। সেখানে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে কিনা তাও ভেবে দেখছে সরকার।
আরও পড়ুন: এক লাফে বোতলজাত পানির দাম দ্বিগুণ করলো ওয়াসা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদহানি হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ব্যবহারের দিকেই যেতে হবে।
একাত্তর/আরএ
