কল্পনা করুন তো ৯৩ বছর বয়সী সুচিত্রা সেনকে। পারছেন না তো? ঘুরে ফিরে ওই চিরতরুণী সাগরিকা, ইন্দ্রানী কিংবা ‘পথে হলো দেরি’র মল্লিকা আপনার চোখের কোণে উঁকি দিচ্ছে,তাই না? হ্যাঁ সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্র ভুবনে এমনই একটি নাম, যা চিরবিস্ময়, চিরউজ্জ্বল!
সুচিত্রা সেন ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার ডাঙ্গাবাড়ী গ্রামের মামা বাড়িতে জন্ম নেন। কিংবদন্তি এই মহানায়িকার ৯৩তম জন্মদিন শনিবার।
তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পাবনার হেমসাগর লেনের পৈত্রিক বাড়িতে। তখন তার নাম রমা দাশগুপ্ত। বাবা ডাকতেন কৃষ্ণা। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত। পাবনাতেই রমা দাশগুপ্তের পড়াশুনা বেড়ে ওঠা। তিনি শহরের মহাকালি পাঠশালা ও পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন।
১৯৪৭ সালে শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। দিবানাথের মামা বিমল রায় ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনিই রমাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। দিবানাথের সম্মতিতে ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবিতে রমা দাশগুপ্তের প্রথম সিনেমায় পদার্পণ। এ ছবিতেই তিনি হয়ে উঠেন সুচিত্রা সেন যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন সুচিত্রা।

মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় পা রাখেন সুচিত্রা সেন। তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’। এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে ‘দেবদাস’ ছবিতে অভিনয় করে পুরস্কৃত হন। ১৯৫৯ সালে ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে নার্সের ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে ‘উত্তরফালগুনী’ ছবিতে মা মেয়ের দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিপরীতে ছিলেন বিকাশ রায়।
‘প্রণয়পাশা’ তার শেষ ছবি (১৯৭৮)। সুচিত্রা সেন তার চলচ্চিত্র জীবনে ৬২টি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। হিন্দি ভাষায় তার সর্বজন প্রশংসিত ছবি হলো ‘আঁধি’ (১৯৭৪)। সঞ্জীবকুমারের বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন। তার অভিনীত অন্যান্য হিন্দি ছবি হচ্ছে ‘মুসাফির’, ‘মমতা’, ‘বোম্বাই কা বাবু’ ইত্যাদি।

জীবনে কম পুরস্কার পাননি তিনি। বেস্ট অ্যাকট্রেস অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও ১৯৭২ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী। ২০০৫ সালে তাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি অন্তরাল ভেঙে পুরস্কার নিতে রাজি হননি। ২০১২ সালে তাকে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ছবিটি বঙ্গ অফিসে সাফল্য লাভ করে। বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম-সুচিত্রা জুটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
পর্দায় মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের জুটি চিরস্মরণীয়। তারা প্রায় ৩০টি ছবিতে জুটিবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে রাশিয়ার মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য স্বীকৃতি পান সুচিত্রা সেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরস্কারজয়ী প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী তিনি।
বলিউডে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু চলচ্চিত্র। তবে পার্বতী চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন। বলিউডে এই অভিনেত্রীর প্রথম ছবি ছিল ‘দেবদাস’।

১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এর পর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে সুচিত্রা সেন অনন্ত অসীমে পাড়ি জমান।
আলোচিত সব নায়ক-নায়িকা ঘিরে ঈদের সিনেমা