ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শহর রাফাহ। অবরুদ্ধ অঞ্চলটির ছোট্ট শহরটিতে প্রায় ১৪ লাখ বাস্তুচ্যুতের বাস। আর সেখানেই বড় অভিযানের চালাতে মরিয়া ইসরাইল। এক্ষেত্রে কারও কথাই শুনছেন না মধ্যপ্রাচ্যের কসাই হিসাবে খ্যাত ইহুদিবাদি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও তার যুদ্ধবাজ মন্ত্রিসভার বিশ্বাস, রাফাহতেই রয়েছে হামাসের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তাই হামাসকে নির্মূল করতে হলে গাজার শেষ আশ্রয়স্থলকে গুড়িয়ে দিতে কবে। আবারও চালাতে হবে গণহত্যা আর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। গেলো কয়েক দিন ধরেই সেই আয়োজনই করে আসছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী।
কিন্তু রাফাহতে অভিযান চালিয়ে, বেসামরিক ফিলিস্তিনি নাগরিকদের হত্যা করা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করা যাবে না সেটি বুঝতে পারছে ইসরাইলের তাবৎ মিত্ররা। আমেরিকা থেকে শুরু করে জার্মানি-ফ্রান্সের মতো দেশও জোর আওয়াজ তুলেছেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে। জো বাইডেন তো রীতিমতো চটে রয়েছেন।
এতে তো মিত্রদের কটমটে চোখ রাঙানি, অন্যদিকে চার দিক থেকে কৈ মাছের মতো ছেঁকে ধরেছে হামাস, হিজবুল্লাহ, ইসলামিক জিহাদ আর হুতিরা। ইরান সমর্থিত এসব প্রক্সি বাহিনীর দাপটে এখন দিশেহারা অবস্থা ইসরাইলের, রীতিমতো কুল রাখি না শ্যাম রাখি অবস্থা দেশটির।

ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে হাজির এই চার সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংগঠনের ইমানি জোসের কাছে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে বিলিয়ন ডলারের কমান্ডো বাহিনী- আইডিএফ। প্রতিদিনই সেনাদের লাশ কাঁধে নিয়ে ফিরতে হচ্ছে ব্যারাকে। স্বজন হারানোর বেদনা ভারি হচ্ছে ইসরাইলের ঘরে ঘরে।
রাফাহ অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যেই ইসরাইলকে চমকে দিয়েছে হামাস যোদ্ধারা। রাফাহ থেকেই ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালিয়েছে হামাস। গাজা সীমান্তবর্তী কেরেম শ্যালম এলাকায় হামাসের রকেট হামলায় চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছে বলে নিজেরাই স্বীকার করেছে ইসরাইলি বাহিনী- আইডিএফ।
এভাবে প্রতিদিনই ইসরাইলের সামনে আরও ভয়ংকর হয়ে হাজির হচ্ছেন হামাসের যোদ্ধারা। সে সঙ্গে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতার ক্ষেত্রে ইসরাইলকে আর ছাড় দেয়ার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। যুদ্ধবিরতি না মানলে ইসরাইলকে কঠিন পরিণতির ঘোষণাও দিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেছিলো, গাজা ছাড়ো, না হয় মর। সেই সঙ্গে ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলো। কথা রেখেছে লেবাননভিক্তিক এই সামরিক গোষ্ঠীটি। ইসরাইলের আরও গভীরে হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহুকে চমকে দিয়েছে।

হিজবুল্লাহ এই ধাপে ইসরাইলের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। সবশেষে ইসরাইলের বিরানিত সামরিক ঘাঁটিতে বুধবার হামলা করেছে হিজবুল্লাহ। এছাড়া একই দিনে আরও একাধিক জায়গায় হামলার দাবি করেছে লেবাননের এই গোষ্ঠীটি।
হিজবুল্লাহ’র দাবি, ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিতে একটি স্বল্পপাল্লার বোরকান রকেট দিয়ে হামলা করেছে তারা। লেবাননের সীমান্তবর্তী ওই জায়গায় সরাসরি আঘাত করেছে। হিজবুল্লাহ আরও জানায়, কাফার শুবা পাহাড়ে ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে হিজবুল্লাহ। এই এলাকাটি নিজের বলে দাবি করে লেবানন।
এর আগে, সোমবার বিকেলে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের মেতুলার কাছে একটি সেনাচৌকিতে ড্রোন হামলা করে হিজবুল্লাহ। সেই ড্রোন হামলায় ইসরাইলের দু’জন রিজার্ভ সেনা নিহত হন। এ ঘটনায় আরও একজন সেনাসদস্য আহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী।
আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর ড্রোন আকাশে ধ্বংস করার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। বিস্ফোরকভর্তি ড্রোনটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং তাতে সেনাসদস্যরা নিহত হন। ড্রোন হামলার আগে লেবানন থেকে গোলান মালভূমিতে কমপক্ষে ৩০টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়।

থেমে নেই ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের দুর্ধর্ষ সামরিক গোষ্ঠী হুতি। স্থলে হামাস আর হিজবুল্লাহ, জলে হুতি। ইসরাইল এবং মার্কিন বাহিনীকে সমুদ্রে বহু আগে থেকেই ঘোল খাওয়াচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা। এবার সরাসরি লোহিত সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীকে পরাজিত করার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, হুতিকে যেভাবে ঘায়েল করার দরকার ছিল, সেভাবে তারা ঘায়েল করতে পারছে না। হুতিরা জানিয়েছে, গাজার রাফাহতে হামলা প্রতিরোধে নতুন মিশনে নেমেছে তারা। এজন্য লোহিত সাগরের পর এখন ভূমধ্যসাগরেও ইসরাইলগামী জাহাজে আক্রমণ চালাবে তারা।
সবশেষ, বৃহস্পতিবার হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে দাবি করেছেন, ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ভারত মহাসগার ও এডেন উপসাগরে কমপক্ষে তিনটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছেন তারা। হুতির দাবি, সবকটি জাহাজই ইসরাইলের। এনিয়ে এখনও কোন কথা বলেনি তেল আবিব।
ইসরাইলকে রাফায় হামলার সবুজ সংকেত যুক্তরাষ্ট্রের