জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে পরিবেশ রক্ষায় গঠন করা হয়েছিল জলবায়ু ট্রাষ্ট তহবিল। কিন্তু সেই টাকায় নওগাঁর হাজার বছরের পুরোনো আলতাদীঘির হাজারো গাছ কেটে ইট পাথরের স্থাপনা তৈরি করছে বনবিভাগ। সেই দিঘী এখন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে সেখানকার জীববৈচিত্র্য। একসময় পদ্ম ফুলে ভরে থাকা সেই দীঘি এখন রীতিমতো মরুভূমি।
যে প্রকল্পে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হয়েছে, সেটিকেই আবার জীব বৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প নাম দেয়া হয়েছে।
এই ছবি দুই বছর আগের আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির অভাব দুর করতে প্রায় এক হাজার বছর আগে প্রায় ৪৩ একর আয়তনের এই দীঘি খনন করা হয় পাল শাসনামলে। এরপর সেই দীঘিকে ঘিরে গড়ে ওঠে শালবন ও জীব বৈচিত্র্য।
হাজার বছরের ঐতিহ্যের সেই দিঘীর বর্তমান চিত্র এটি। দীঘিটি সংস্কারের নামে জলবায়ু তহবিলের প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা খরচ করে উন্নয়নের নামে কেটে ফেলা হয়েছে হাজারেরও বেশী গাছ। তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের স্থাপনা। অথচ দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের সুরক্ষায় গঠন করা হয়েছিলো জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল। উল্টো হাজারও গাছ কেটে শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা এখানকার জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পশুপাখি ধরা ও গাছ কাটা নিষেধ হওয়ার পরও এখানকার এতগুলো গাছ কাটলো সরকার। এরপর তারা বলছে এটা জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করেছে। কিভাবে কি হচ্ছে বুঝছেন না তারা।
তারা আরও জানান, এখানে অনেক গাছ ছিলো। প্রায় ঘন বনের মতো। সেসব গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে। মাটি ফেলা হয়েছে এদিকে। এখন এদিকে হাঁটাচলার পরিবেশও ঠিক নেই। রীতিমতো মরুভূমির মতো পরিবেশ এখন।
২০১১ সালে নওগাঁর আলতাদীঘি এলাকাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানের গাছ কোনভাবেই কাটা যাবে না। কিন্তু জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের নেশায় সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে খোদ বনবিভাগ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নওগাঁর সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আলতাদিঘীর উন্নয়ন কাজ শুরুর আগে সভায় সিদ্ধান্ত ছিলো গাছ না কেটেই উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু, আদতে দেখা গেলো, উন্নয়ন কাজ শুরুর আগেই সব গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলা হয়েছে। এখন গাছ কেটে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ করে উন্নয়ন কাজ চলছে।
নওগাঁর সামাজিক সংগঠক জয়নাল আবেদীন মুকুল জানান, বন ধ্বংস করে উন্নয়নের পরিকল্পনা একটা ভুল নীতি। আর এসব উন্নয়ন প্রকল্পে হচ্ছে হরিলুট। আজকের কর্তনকৃত গাছগুলো হতে সময় লেগেছে ২০ থেকে ২৫ বছর। অথচ নিমিষের মধ্যে তা ধ্বংস করা হলো। আধুনিক নকশায় গাছ রেখেই সুন্দর পরিকল্পনা করা সম্ভব।

বন রক্ষা না করে পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের লোভে যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে, সেই দীঘি না থাকায় এখন পর্যটক কমে গেছে। পর্যটকদের দাবি, এমন মরুময় অবস্থা নয়, আগের আলতাদীঘি দেখতে চান তারা।
জলবায়ুর তহবিল থেকে কোনো প্রকল্প পাশ হাবার আগে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও সেটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কি ভূমিকা রাখবে তা যাচাই-বাছাই করার কথা। প্রকৃতির গাছ কেটে ইট-পাথরের একটি প্রকল্প কীভাবে অনুমোদন হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদরা।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান বলেন, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে সরাসরি পদক্ষেপ রাখা। কার্বন নির্গমন কমাতে ও অভিযোজনের জন্য এ ফান্ড ব্যবহার হতে পারে। অথচ দুটোর কোনটাই এ প্রকল্পে হচ্ছেনা। গাছ লাগিয়ে কোথায় কার্বন ইমিশন কমানোর ব্যবস্থা করার কথা, উল্টো এখানে গাছ কাটা হয়েছে। প্রতিবেশগত ক্ষতির কোনো সমীক্ষা ছাড়াই এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের পরিচালকও স্বীকার করেছেন পরিবেশগত কি ক্ষতি হতে পারে তার কোনো সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়।
রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান শাহ এ বিষয়ে জানিয়েছেন, কোনো সমীক্ষা না হওয়ার ফলে কি কি ক্ষতি হতে পারে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যেহেতু এখন পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, বৃষ্টি কম হচ্ছে, তাই আপাতত ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে দীঘিটি ভরাট করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
একসময় পদ্মফুলে ভরা থাকতো যে দিঘি সেটি আজ মরুময়। বরেন্দ্র এলাকায় এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির অভাব। আলতাদিঘীর পানি ফিরিয়ে আনতে এখন ভূগর্ভের পানি তোলার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান জানান, সরকারী খরচে উত্তরাঞ্চলে কোনো ধরনের ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সেচ প্রকল্প হবে না। সে বিষয়ে বিএমডি থেকে নির্দেশনা আছে। সুতরাং ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে দীঘি ভরাটের আইডিয়া তারা কোত্থেকে পাচ্ছেন, সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না!
স্থানীয়রা বলছেন, এই প্রকল্পে প্রচুর শাল গাছও কাটা পড়েছে। তবে প্রধান বন সংরক্ষকের দাবি, এখনে কোন শালবন ছিল না। ছিল ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি। এসব বিদেশি গাছ কেটে এবার তারা দেশি প্রজাতির নতুন গাছ লাগাবেন।
রাজশাহী অঞ্চলের বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, জলজ জীববৈচিত্র্য ওখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই দীঘির পানি রাখাটাও ওখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। আলতাদীঘিটি দীর্ঘদিন যাবত খনন ও সংস্কার না করার কারণে দীঘিটির গভীরতা কমে গিয়ে প্রায় ১ ফুটের উচ্চতার নিচে পানি ছিল এবং চারপাশের পাড়গুলো ভেঙে যাওয়ায় দীঘিটি পুনঃখনন ও পাড় সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছিল।
তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ৬৪৯.৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বন অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মাধ্যমে দীঘিটির খনন কার্যক্রমের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। খননকৃত মাটি দিয়ে দীঘিটির চর্তুপার্শ্বের পাড় মেরামত ও উঁচুকরণ করার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। আলতাদীঘির পাড়জুড়ে সামাজিক বনায়নের আওতায় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি প্রজাতির চারা দ্বারা বনায়নকৃত গাছগুলি অপসারণ করে স্থানটি দেশীয় প্রজাতির চারা দ্বারা প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা করা হয়।

একসময় পাখির শব্দে মুখর থাকা আলতাদীঘি এখন পাখি শূন্য। সুপেয় পানির অভাবে বন বিড়াল, বেজি, খেঁকশিয়ালের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলোর অস্তিত্বও হুখকির মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ মূলত ব্যয় হওয়ার কথা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেসব এলাকায় বা যে জায়গাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা দিচ্ছে, সে জায়গাগুলোতে। কিন্তু আলতাদীঘি এরকম কোনো অঞ্চলের মধ্যেই পড়েনা। উল্টো এ ফান্ডের টাকা ব্যয় করে এখানে গাছ কেটে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে জলবায়ু ও প্রতিবেশ পুরোপুরি বিনষ্ট করে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে