ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনের ব্যক্তিগত কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ ১৮ হাজার ১০৭ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। হাসিনা নিজেই এই পিয়নের দুর্নীতির কথা হাসতে হাসতে জানিয়েছিলেন।
দুদক জানিয়েছে, লেনদেনগুলো জাহাঙ্গীর আলম এবং তার মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আটটি ব্যাংকের ২৩টি হিসাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ভোগ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
এছাড়া, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ১৮ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার ৮৮২ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মঙ্গলবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুদকের উপপরিচালক রাশেদুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে অর্জিত ২৪ কোটি টাকার সম্পদ ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি জানান, জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৮০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪২ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়েছে। কামরুন নাহার, যিনি একজন গৃহিণী, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের সহায়তায় দুটি ব্যাংকে সাতটি সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাব খুলে মোট ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৫৫ টাকার লেনদেন করেছেন।
দুদক কর্মকর্তা জানান, এই অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীর আলম স্থাবর ও অস্থাবর মিলে ১৮ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার ৮৮২ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
এছাড়া, তিনি তার নিজ নামে এবং মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আটটি ব্যাংকের ২৩টি হিসাবে মোট ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ ১৮ হাজার ১০৭ টাকা জমা করেন এবং ৬২৪ কোটি ৬০ লাখ ১৫ হাজার ৬৭১ টাকা উত্তোলন বা স্থানান্তর করেন। দুদকের অনুসন্ধানে এই লেনদেনকে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন নাম ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খুলে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে তার হিসাবে জমা করেন। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন পন্থায় উত্তোলন বা স্থানান্তর করেন। তার মালিকানাধীন 'স্কাই রি এরেঞ্জ' নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০২৪ সালের প্রথম পাঁচ মাসে মাত্র ৮৩ কার্যদিবসে ১৭৮ কোটি টাকা জমা হয় এবং একই সময়ে ১৭৮ কোটি ৯৩ টাকা উত্তোলন বা স্থানান্তর করা হয়।
অন্যদিকে, তার স্ত্রী কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে করা মামলায় বলা হয়েছে, তিনি নিজ নামে ৬ কোটি ৮০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪২ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন। দুদকের মতে, তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই। ওই দিন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমার বাসার পিয়ন ছিল, সেও নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না।
শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের পর থেকেই আলোচনায় আসেন জাহাঙ্গীর আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে দেশজুড়ে নানা সমালোচনা হতে থাকে। সরকার তখন তার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। জব্দ করা হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। পরে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম পরিবারসহ আমেরিকায় পালিয়ে গেছেন।
৯ প্রকল্পে অনিয়ম: হাসিনা-রেহানা-জয়-টিউলিপের দুর্নীতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত
তিন মাস দেশেই লুকিয়ে ছিলেন ওবায়দুল কাদের!