স্পেনের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তীব্র উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে আর্জেন্টিনার ফুটবল ভক্তদের। আর এই স্নায়ুচাপ সামলাতে আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের এখন একমাত্র ভরসা, নানা অদ্ভুত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন ‘টোটকা’ বা সৌভাগ্যের আচার-অনুষ্ঠান!
সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে লিওনেল মেসির দল এখন শিরোপা ধরে রাখার থেকে মাত্র এক ম্যাচ দূরে। কিন্তু মাঠের উত্তাপের চেয়েও গ্যালারি আর ড্রয়িংরুমের উত্তেজনার পারদ যেন আকাশ ছুঁয়েছে, আর তা সামাল দিতেই কোমর বেঁধে নেমেছেন আর্জেন্টাইনরা।

লাতিন আমেরিকার এই দেশটিতে ফুটবল নিয়ে অন্ধবিশ্বাস এবং ‘কাবালা’ (সৌভাগ্য বয়ে আনার বিশেষ আচার) অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। বুয়েনস আইরেসের লিনিয়ার্স এলাকার কট্টর ফুটবলপ্রেমী ৪৮ বছর বয়সী অ্যাকাউন্ট্যান্ট আন্দ্রেস গঞ্জালেস বেশ জোর দিয়েই বললেন, ম্যাচ চলার সময় যে যেখানে বসে খেলা দেখছিল, গোল হওয়ার পর কেউ সেই জায়গা থেকে এক চুলও নড়তে পারবে না! এমনকি খেলা দেখার সময় আপনি যদি বাথরুমে যান আর ঠিক তখনই আর্জেন্টিনা গোল পেয়ে যায়, তবে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে ওখানেই বন্দি থাকতে হবে। এটা অলিখিত নিয়ম!
এই পাগলামি শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, স্বয়ং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-ও এর বাইরে নন। তিনিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিয়ম ভাঙবেন না এবং প্রেসিডেন্ট ভবন থেকেই বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখবেন।

অন্যদিকে, ৬৫ বছর বয়সী বিক্রেতা এস্তেলা ভার্গাসের বাড়ির নিয়ম আরও কড়া। ম্যাচের সময় সবাইকে একই জামাকাপড় পরে একই চেয়ারে বসতে হবে। এমনকি বাদ যাবে না পোষা কুকুরটিও! এস্তেলা হাসতে হাসতে বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের সময় আমাদের কুকুরটা যেহেতু ‘ইংলিশ বুলডগ’ জাতের ছিল, তাই ওকে আমরা আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে দিয়েছিলাম। আর স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের দিন রোদ হোক বা বৃষ্টি, ওকে আমরা ঘরের বাইরেই রাখব!
গ্রাসিয়েলা ক্যাম্পোসের বাড়িতে আবার ম্যাচের সময় তাঁর শাশুড়িকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়, যিনি রান্নাঘরে বসে আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে নীল-সাদা স্কার্ফ বোনেন।
সমাজবিজ্ঞানী ডিয়েগো মুর্জি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, আর্জেন্টাইনরা নিজেদের শুধু দর্শক ভাবেন না, তারা ভাবেন তারাও ম্যাচের অংশ। আর এই টোটকাগুলো হলো নিজেদের সেই লড়াইয়ের সাথে যুক্ত রাখার এবং অপয়া শক্তিকে দূরে রাখার একটা উপায়।

তিনি ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি কোচ কার্লোস বিলার্দোর উদাহরণ টেনে বলেন, বিলার্দো বিজ্ঞানের মানুষ হয়েও চরম কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। একবার এক ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমের ফোন বেজে উঠলে এক খেলোয়াড় তা রিসিভ করে দেখেন ওপাশে কেউ নেই। যেহেতু সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল, তাই বিলার্দো নিয়ম করেছিলেন প্রতি ম্যাচের আগে ওই ফোনে ঠিক একইভাবে কল দেওয়া হবে এবং সেই নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ই ফোনটি ধরবেন এবং ওপাশে কেউ কথা বলবে না!
ফাইনালের আগে পুরো বুয়েনস আইরেস এখন নীল-সাদায় সেজেছে। ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত লিদিয়া ওতেরো দাবি করেন, তাঁর সব টোটকা একশ ভাগ কাজ করে। সেমিফাইনালের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রথমার্ধে আমার কুকুরটা টিভির দিকে তাকিয়ে ছিল আর আর্জেন্টিনা কোনো গোল পাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে আমি কুকুরের মুখটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলাম, আর তখনই ম্যাচের ভাগ্যও ঘুরে গেল!

২০২০ সালে প্রয়াত ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা এখনও এই ভক্তদের কাছে আরাধনার পাত্র। তাঁর পুরোনো বাড়ির সামনে রীতিমতো বেদি বানিয়ে প্রার্থনা চলছে। এমনকি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ‘ফ্রিজ’ বা স্তব্ধ করে দেওয়ার আদিম টোটকাও বাদ যাচ্ছে না। ১১ বছর বয়সী মেসি-ভক্ত রদ্রিগো সের্না বেশ গম্ভীর মুখে জানাল, আমি স্পেনের সেরা খেলোয়াড়দের স্টিকার নিয়ে সোজা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিই। আমার দাদু আমাকে এই বুদ্ধি শিখিয়েছেন!
মাঠে মেসিরা পায়ের জাদুতে যা-ই করুন না কেন, মাঠের বাইরে ভক্তদের এই টোটকা আর কুসংস্কারের মহাযজ্ঞই প্রমাণ করে, ফুটবল আর্জেন্টিনার শুধু স্রেফ কোনো খেলা নয়, এক পরম ধর্ম!
তথ্যসূত্র: এএফপি
